কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭০ ।। নির্বাচনের কাছাকাছি বাংলাদেশ: শান্তি নাকি সংঘাত ?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭০ ।। নির্বাচনের কাছাকাছি বাংলাদেশ: শান্তি নাকি সংঘাত ?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭০ ।।

নির্বাচনের কাছাকাছি বাংলাদেশ: শান্তি নাকি সংঘাত ?

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।


বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। একটি নির্বাচন হওয়া উচিত নাগরিক উৎসবের মতো—যেখানে মানুষ ভয় নয়, ভরসা নিয়ে কেন্দ্রে যায়; যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু রক্তপাত থাকবে না। অথচ  নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ততই আমাদের সামনে এক ভয়ংকর প্রশ্ন তুলে ধরছে—আমরা কি শান্তির পথে হাঁটছি, নাকি সংঘাতকে স্বাভাবিক করে তুলছি?

মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ১৮টি। এসব ঘটনায় নিহত হন ৪ জন এবং আহত হন ২৬৮ জন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, জানুয়ারি মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫টি সহিংসতায়। এতে নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬১৬ জন। এই পরিসংখ্যান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক উত্তেজনার চিত্র নয়—এটি একটি বিপজ্জনক অবনতির দলিল।

আরও উদ্বেগজনক হলো জানুয়ারি মাসের ভেতরের প্রবণতা। মাসের প্রথম ১০ দিনে ৮টি সহিংস ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। পরবর্তী ১০ দিনে (১১–২০ জানুয়ারি) ১৮টি ঘটনায় নিহত হন ২ জন এবং আহত হন ১৭৬ জন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর, অর্থাৎ ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারির মাত্র ১১ দিনে, সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়—এই সময়ে ঘটে ৪৯টি সহিংসতার ঘটনা, নিহত হন ৪ জন এবং আহত হন ৪১৪ জন।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে বলে দেয়, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির মাঠ ক্রমশ সহিংসতার দিকে মোড় নিচ্ছে। যে সময়টিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মানুষের কাছে গিয়ে তাদের কর্মসূচি, ভাবনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরার কথা, সেই সময়টিতেই লাঠি, আগুন ও অস্ত্রের ভাষা বেশি শোনা যাচ্ছে।

এই সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—সাংবাদিকদের ওপর হামলা। ডিসেম্বর মাসে যেখানে ১১ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত বা বাধাগ্রস্ত হয়েছেন, জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। গণতন্ত্রে সংবাদকর্মীরা কেবল পেশাজীবী নন; তারা সমাজের বিবেক। তাদের কণ্ঠরোধ করা মানে জনগণের জানার অধিকারকে আঘাত করা।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অধিকার আজ বহু মানুষের জন্য কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।

এই পরিস্থিতির দায় কার?


প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর। তাদের উচিত স্পষ্টভাবে সহিংসতা পরিহারের ঘোষণা দেওয়া এবং নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের। আইন প্রয়োগে কোনো পক্ষপাত না রেখে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের—সাধারণ নাগরিকদের। আমরা যেন ঘৃণা, গুজব ও উসকানিমূলক কথাবার্তা থেকে দূরে থাকি এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নিই।

নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি একটি জাতির মানসিকতার পরীক্ষা। আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ভোটের আগে লাশ গোনা হবে? নাকি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু মানুষ নিরাপদ থাকবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। নীরবতা নয়, দায়িত্বশীল অবস্থানই পারে সহিংসতার এই চক্র ভাঙতে।

 শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায়  এখনই যেসব পদক্ষেপ নেওয়া  দরকার:  

  • রাজনৈতিক দলগুলোকে লিখিতভাবে সহিংসতা পরিহারের অঙ্গীকারনামা প্রকাশ ও তা বাস্তবায়নে কঠোর অভ্যন্তরীণ নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

  • প্রতিটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে সহনশীলতা ও সংযমের আহ্বান জানাতে হবে এবং উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে হবে।

  • অবৈধ ও বৈধ অস্ত্র খুবই দ্রুত উদ্ধার করতে হবে।
  • নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি শক্তিশালী ও সক্রিয় মনিটরিং সেল গঠন করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেভাগে চিহ্নিত করতে হবে।

  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলনিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালনের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।

  • সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃশ্যমান বিচারিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি ও দ্রুত ফ্যাক্ট-চেক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

  • সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা হটলাইন ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম গঠন করা প্রয়োজন।

  • সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি-শৃংখলা রক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

  • ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে কঠোরভাবে তা কার্যকর করতে হবে।

  • নির্বাচন শেষে বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে।

  • সাধারণ নাগরিকদের জন্য শান্তিপূর্ণ আচরণ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়ে গণসচেতনতা প্রচার জোরদার করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক

লন্ডন, ৩ ফেব্রূয়ারি ২০২৬