বাংলাদেশ সংবাদ

বাংলাদেশে কেউ আর নিরাপদ নন—টাকায় মিলছে আপনার মুঠোফোনের গোপন তথ্য

বাংলাদেশে কেউ আর নিরাপদ নন—টাকায় মিলছে আপনার মুঠোফোনের গোপন তথ্য

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১০ সেপ্টেম্বর :

একটি মুঠোফোন নম্বরই যেন এখন একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ঢোকার চাবি। কার সঙ্গে কথা বলেন, কখন কথা বলেন, কোথায় অবস্থান করেন—এসব তথ্য অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। শুধু সাধারণ নাগরিক নন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্যও এই অনলাইন বাজারের বাইরে নেই।

একটি অনুসন্ধানে একজন মন্ত্রীর তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড বা সিডিআর অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করা হয়। পরে মন্ত্রীর নিজের ফোনের সঙ্গে সেই তথ্য মিলিয়ে দেখা হলে সিডিআরের তথ্য সঠিক বলে মিলে যায়। বিষয়টি দেখে মন্ত্রীর বিস্মিত প্রতিক্রিয়া—যদি এমন তথ্য এভাবে পাওয়া যায়, তাহলে নিরাপদ কে?

একইভাবে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার প্রধানের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআরও অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরে তথ্যগুলো যাচাই করে সঠিক বলে নিশ্চিত করেন।

এখানেই উদ্বেগের সবচেয়ে বড় জায়গা। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা যদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঘটে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের তথ্য কতটা সুরক্ষিত—সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো।

অনলাইনে পরিচালিত বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এসব তথ্য বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। শুধু সিডিআর নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টের নথি, টিআইএন, অবস্থানের তথ্য, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং মোবাইল আর্থিক সেবাসংক্রান্ত তথ্যও অর্থের বিনিময়ে সরবরাহের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারও তিন মাসের সিডিআর পেতে প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ছয় মাসের জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব জানিয়েছিল, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টির বেশি পোস্টের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মানুষের যোগাযোগ ও অবস্থানের তথ্য অপরাধী চক্রের হাতে গেলে তা শুধু গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারও গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাকে অনুসরণ, হয়রানি বা অন্য কোনো অপরাধে এসব তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব।

বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকের কল ও এসএমএস-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করে। সিডিআরে সাধারণত কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ হয়েছে, কতক্ষণ কথা হয়েছে এবং যোগাযোগের সময় কোন মোবাইল টাওয়ার ব্যবহৃত হয়েছে—এ ধরনের তথ্য থাকতে পারে। এর সঙ্গে মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বরও যুক্ত থাকতে পারে।

তবে সিডিআরের মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপের কথোপকথনের বিষয়বস্তু জানা যায় না—এটি আলাদা বিষয়।

তাহলে প্রশ্ন—অপারেটরদের সংরক্ষিত তথ্য বাইরে যাচ্ছে কীভাবে?

একটি মোবাইল অপারেটরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

অন্যদিকে গ্রামীণফোন ও রবি জানিয়েছে, গ্রাহকের তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যক্তিরাই এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পান।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি বলছে, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

তথ্য ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা ৩৬টি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩২টি।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার নিয়েও অতীতে বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির যদি দুর্বল থাকে, তাহলে তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মুঠোফোনের তথ্য বিক্রির ঘটনাকে তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার ওপর আস্থার প্রশ্ন।

একজন নাগরিক কার সঙ্গে কথা বলেন, কখন কোথায় যান কিংবা কোন সময়ে কোথায় ছিলেন—এসব তার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। তার অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার বা বিক্রি হলে ব্যক্তিগত অধিকার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই তথ্যগুলো কোথা থেকে বের হচ্ছে, কারা সংগ্রহ করছে, কারা বিক্রি করছে এবং কারা কিনছে?

শুধু কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত করা, কে কখন তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করেছে তার ডিজিটাল রেকর্ড পরীক্ষা করা, অনুমোদনবহির্ভূত প্রবেশের পথ বন্ধ করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

কারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য যদি টাকার বিনিময়ে বাজারে পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে রাষ্ট্র নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে?