ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
সিঙ্গাপুর বিশ্বসেরা, শিক্ষার আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় নেই বাংলাদেশের নাম
ভয়েস অব পিপল, শিক্ষা ডেস্ক রিপোর্ট, ১০ সেপ্টেম্বর:
বিশ্বের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, বিজ্ঞান, গণিত ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ে আবারও চমক দেখিয়েছে সিঙ্গাপুর। তবে একই আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের নামই নেই। ফলে বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের দক্ষতার সরাসরি তুলনাও করা যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা—ওইসিডির প্রকাশিত PISA 2025 ফল অনুযায়ী, বিজ্ঞান, গণিত ও পড়ার দক্ষতা—এই তিন ক্ষেত্রেই সিঙ্গাপুর ও চীনের বেইজিং, সাংহাই, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াং অঞ্চল সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও গণিতে শীর্ষে রয়েছে চীনের ওই চার অঞ্চল, আর পড়ার দক্ষতায় প্রথম সিঙ্গাপুর।
সিঙ্গাপুরের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে গড়ে ৫৬০, গণিতে ৫৬৩ এবং পড়ার দক্ষতায় ৫৩৫ স্কোর করেছে। গণিত ও বিজ্ঞানে সিঙ্গাপুর দ্বিতীয় হলেও পড়ার দক্ষতায় দেশটি বিশ্বের প্রথম। কম্পিউটারভিত্তিক সমস্যা সমাধানেও সিঙ্গাপুরের অবস্থান শীর্ষ সারিতে—গড়ে ৫৬৩ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয়।
এবারের PISA-তে ৯১টি দেশ ও অর্থনীতির ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। পরীক্ষায় শুধু মুখস্থ জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীরা বাস্তব পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে কি না, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে কি না এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না—সেসব বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ফলের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে সর্বোচ্চ দুই স্তরের দক্ষতা—লেভেল ৫ বা ৬—অর্জন করেছে। যেখানে ওইসিডি দেশগুলোর গড় মাত্র ৮ শতাংশ। পড়ার দক্ষতায়ও সিঙ্গাপুরের ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে ওইসিডি গড় ৬ শতাংশ।
এবার আসা যাক বাংলাদেশে।
PISA 2025-এর অংশগ্রহণকারী ৯১টি দেশ ও অর্থনীতির তালিকায় বাংলাদেশ নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য এবারের পরীক্ষায় কোনো স্কোর, অবস্থান বা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্ক প্রকাশিত হয়নি। ফলে ‘বাংলাদেশ কত নম্বরে’—এই প্রশ্নেরও PISA-ভিত্তিক কোনো উত্তর নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের অন্যদের তুলনায় কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে—সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের Learning Poverty বিশ্লেষণে বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ের পড়ার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এই সূচক মূলত ১০ বছর বয়সের মধ্যে শিশুরা বয়সোপযোগী একটি লেখা পড়ে বুঝতে পারে কি না, সেই মৌলিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়।
একদিকে সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা ১৫ বছর বয়সেই শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ, যুক্তি, বিজ্ঞান, গণিত ও ডিজিটাল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রাথমিক পর্যায়েই পড়া বুঝে শেখার মৌলিক দক্ষতা কতটা অর্জন করছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, PISA 2025 দেখিয়েছে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও শিক্ষার মান নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। ওইসিডি দেশগুলোর গড় হিসাবে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গণিতের ফল ৯ পয়েন্ট এবং পড়ার দক্ষতা ১৪ পয়েন্ট কমেছে। বিজ্ঞান মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার ফলাফলে অবনতির প্রবণতা রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলেই সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশের স্কুলশিক্ষা কি মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শিশুদের পড়া বুঝে শেখা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, গণিত প্রয়োগ, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং ডিজিটাল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করতে পারছে?
PISA-তে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে—বিশ্ব যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত করছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীদের আমরা ঠিক কোন দক্ষতার জন্য প্রস্তুত করছি?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আসল পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।