ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
যে সাপ্লিমেন্টগুলো উপকারী ভাবতেন, বয়স বাড়লে সেগুলোই কি ক্ষতিকর?
স্বাস্থ্য ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল :
ভিটামিন ডি, ওমেগা-৩ ফিশ অয়েল কিংবা গ্লুকোসামিন—স্বাস্থ্য ভালো রাখতে বহু মানুষ নিয়মিত এসব সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব বহুল ব্যবহৃত সাপ্লিমেন্টের কিছু উপাদান মস্তিষ্কে প্রত্যাশিত উপকারের বদলে ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি গবেষণায় বয়স্ক মানুষের মধ্যে ভিটামিন ডি, ওমেগা-৩ এবং গ্লুকোসামিন ব্যবহারের সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরাই সতর্ক করে বলেছেন, এসব ফলাফল এখনো চূড়ান্ত নয় এবং সাপ্লিমেন্টগুলো সরাসরি স্মৃতিশক্তি বা মস্তিষ্কের ক্ষতি করে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণায় ৫ হাজার ৬৫ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৬৭ বছর। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের রক্তে আগে থেকেই ভিটামিন ডির মাত্রা স্বাভাবিক ছিল, তাদের মধ্যে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের সামগ্রিক জ্ঞানীয় ক্ষমতা ও নির্বাহী দক্ষতা কিছুটা দ্রুত কমেছে। তবে যাদের ভিটামিন ডির ঘাটতি বা অপর্যাপ্ত মাত্রা ছিল, তাদের ক্ষেত্রে একই সম্পর্ক দেখা যায়নি।
আরেকটি বিশ্লেষণে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক দ্রুত কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিপূর্ণ মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে গ্লুকোজ ব্যবহারের মাত্রাও কম দেখা যায় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের মধ্যে।
জুনে প্রকাশিত গ্লুকোসামিন নিয়ে গবেষণাটিও বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও জয়েন্টের ব্যথার জন্য ব্যবহৃত এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণকারীদের মধ্যে হালকা জ্ঞানীয় দুর্বলতা থেকে আলঝেইমার বা অন্য ধরনের ডিমেনশিয়ায় অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি দেখা গেছে। একই গবেষণায় ইতিমধ্যে আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে গ্লুকোসামিন ব্যবহারের সঙ্গে মৃত্যুহার প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্পর্কও পাওয়া যায়।
তবে গবেষকেরা নিজেরাই বলছেন, এসব তথ্যকে সরাসরি ‘গ্লুকোসামিন ডিমেনশিয়া ঘটায়’ বা ‘ফিশ অয়েল মস্তিষ্ক নষ্ট করে’—এভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ অধিকাংশ গবেষণাই পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ যারা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন এবং যারা করেন না, তাদের জীবনযাপন, আয়, শিক্ষা, শারীরিক অবস্থা কিংবা অন্য স্বাস্থ্যগত বিষয়েও পার্থক্য থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের আগ্রহের একটি বড় জায়গা হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তন। মস্তিষ্ককে বাইরের বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ থেকে সুরক্ষা দেওয়া ‘ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার’ বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কে চর্বি, ক্যালসিয়াম, গ্লুকোজ ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসে। ফলে যে উপাদান তরুণ বা সুস্থ মস্তিষ্কে উপকারী কিংবা নিরপেক্ষ, বয়স বাড়লে সেটি একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
গবেষকদের মতে, এখানেই সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কোনো একটি সাপ্লিমেন্ট সবার জন্য উপকারী কি না, শুধু সেটি জানাই যথেষ্ট নয়; বরং কার জন্য, কোন বয়সে এবং কোন শারীরিক অবস্থায় সেটি উপকারী বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে নতুন গবেষণাগুলোর ভিত্তিতে বয়স্ক মানুষকে হঠাৎ করে ভিটামিন ডি, ওমেগা-৩ বা গ্লুকোসামিন বন্ধ করার পরামর্শ দেননি গবেষকেরা। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করা এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী এর ব্যবহার নির্ধারণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের সারকথা হলো, ‘সাপ্লিমেন্ট মানেই নিরাপদ’—এই ধারণাটি সব ক্ষেত্রে ঠিক নাও হতে পারে। ওষুধের মতো সাপ্লিমেন্টও শরীরে জৈবিক প্রভাব ফেলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীর ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে বলে একই সাপ্লিমেন্টের প্রভাবও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু ‘ভিটামিন ডি, ফিশ অয়েল বা গ্লুকোসামিন ভালো কি না’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কাদের জন্য ভালো, কতটা ভালো এবং জীবনের কোন বয়সে তা ভালো? সুতরাং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ভিটামিন খাওয়া থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।