ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২২ ।। চাঁদাবাজি, খুন, সন্ত্রাস, মব, ডেংগু মশা : এই নিয়ে দেশের মানুষের মরণ দশা
উৎসর্গ
জন্মভূমির সেইসব মানুষদের,
যারা প্রতিদিন ভয়, অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামের ভেতরেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন
লন্ডনে দীর্ঘদিন ধরে স্বপরিবারে বসবাস করছি। জীবনের বড় একটি অংশ কেটে গেছে এই শহরের ব্যস্ততা, নিয়ম আর স্থিতিশীলতার মধ্যে। তবু ভোরে ঘুম ভাঙার পর অভ্যাসবশত হাত চলে যায় বাংলাদেশের পত্রিকা বা টিভি খবরের দিকে। জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্কটা এমনই—দূরত্ব বাড়ে, কিন্তু টান কমে না। আত্মীয়-স্বজন এখনও সেখানে আছে, শৈশবের স্মৃতি সেখানে, প্রিয় মানুষের কবরও সেখানে। হয়তো সেই জন্মঋণের কারণেই প্রতিদিন দেশের খবর পড়তে বসি। কিন্তু ইদানীং খবরগুলো পড়তে পড়তে বুকের ভেতর এক ধরনের অজানা পেরেশানি ও ভয় জেগে ওঠে। মনে হয়, আমরা তো এত কদর্জ আর ভয়ংকর বাংলাদেশ রেখে আসিনি।

প্রতিদিন যেন নতুন কোনো আতঙ্ক অপেক্ষা করে থাকে। কোথাও হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যু, কোথাও অতিবৃষ্টিতে ফসল ডুবে গেছে, কোথাও বজ্রপাতে একসঙ্গে কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছে। সড়কে মৃত্যুর খবর এমনভাবে আসছে যেন মানুষের জীবন মাছি-মশার চেয়েও সস্তা হয়ে গেছে। তার ওপর আছে বন্যা, বজ্রপাতে মৃত্যু, ডেঙ্গু, দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার দৌড়, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস আর খুনের খবর। দূরে থেকেও মনে হয়, দেশটা যেন এক অদৃশ্য চাপে হাঁসফাঁস করছে। হামে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে চারশর উপরে শিশু মারা গেছে। প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছে ১০/১২ জন অবুঝ শিশু। এদের বাবা-মাকে স্বান্তনা দেওয়া কিছু আছে কি?
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই খবরগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন মনে হয় না। বরং মনে হয়, সব সংকট মিলেমিশে মানুষের জীবনের ওপর এক বিশাল বোঝা হয়ে বসেছে।

সকাল শুরু হয় খবরে। কোথাও লাশ উদ্ধার, কোথাও প্রকাশ্যে গুলি, কোথাও গণপিটুনি, কোথাও আবার ঘরের ভেতরেই নির্মম হত্যাকাণ্ড। সমাজে সহিংসতা যেন ধীরে ধীরে দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। আর তার পাশাপাশি আছে ডেঙ্গু মশার নীরব আক্রমণ। একদিকে মানুষ অপরাধে মরছে, অন্যদিকে রোগে; মাঝখানে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছে।
তার পর মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’র খবরাখবর। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও দেখছি ১৫/২০ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছে রাস্তায়। দেশের মানুষদের ফোন করলে ওরা বলে,‘বিশ কোটি লোকের দেশে এরকম কিছু কিছু ঘটনা তো ঘটবেই। এটা ওদের কাছে স্বাভাবিক লাগে। তখন মনটা বিষিয়ে ওঠে। এই কি আমাদের দেশের মানুষের সহমর্মিতা অপরের জন্যে? অবশ্য অনেক প্রবাসী এসব খবরাখবর থেকে চোখ বন্ধ করে থাকেন। তাদের দেশের খবরের প্রতি কোনই আগ্রহ নেই। একদিক থেকে ওরা ভালই আছেন। বিশেষ করে আমাদের পরের প্রজন্ম, এমনকি আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ‘দেশ নিয়ে’ তেমন মাথা ঘামাতে চান না। ওদের ভাষায়, দেশের এসব লিখে আর পড়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট হয়। তবে চোখ বন্ধ করে রাখলে কি আর প্রলয় বন্ধ হয়?
চাঁদাবাজি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ দোকানদার পর্যন্ত অনেকেই এটিকে “নিয়তি” বলে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে হুমকি, হামলা, কখনও প্রাণনাশ। এই ভয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; মানুষের মানসিক নিরাপত্তাও কেড়ে নিচ্ছে।

খুনের ঘটনাগুলো আরও বেশি নাড়া দেয়। গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যা, ময়মনসিংহে শিশু রাফিকে অপহরণের পর নির্মম হত্যা, নারায়ণগঞ্জে গলাকাটা মরদেহ—এসব খবর পড়লে মনে হয়, মানুষ যেন ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে পরিবারের ভেতরে। যে পরিবার একসময় নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় ছিল, আজ সেখানে পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়েছে।

মব সহিংসতা সমাজের আরেক ভয়াবহ অসুখ। সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা এখন আর বিরল ঘটনা নয়। সেদিন গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে হত্যা করলো জনতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে, আর কিছু মানুষ সেটিকে “তাৎক্ষণিক বিচার” বলে সমর্থনও দেয়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি সমাজের মানবিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি।
সন্ত্রাস ও ভয়ভীতির সংস্কৃতিও কম উদ্বেগের নয়। প্রকাশ্যে হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, এলাকায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার—এসব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ যেন নীরব আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছে। যারা প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়, তারা জানে না সন্ধ্যায় নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না।

এর পাশাপাশি আছে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। প্রতিবছর একই আলোচনা, একই অভিযান, একই প্রতিশ্রুতি—কিন্তু মশা যেন আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, জমে থাকা পানি—সব মিলিয়ে ডেঙ্গু এখন মৌসুমি রোগ নয়, বরং নগর জীবনের স্থায়ী আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
দূরে বসে এসব খবর পড়তে পড়তে কখনও মনে হয়, আমি তো এখন সেই সমাজে বাস করছি না। লন্ডনের নিরাপদ রাস্তায় হাঁটি, নিয়ম মেনে চলা এক শহরে থাকি। কিন্তু জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়, মানসিকও। তাই দেশের খবর পড়লে মনে হয়, ওই আতঙ্কের এক অংশ এখনও আমার ভেতরেও রয়ে গেছে। দূরে থেকেও মুক্তি মেলে না।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষ যেন ধীরে ধীরে এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। আগে একটি খুনের খবর সমাজকে নাড়িয়ে দিত, এখন তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরেকটি ঘটনার নিচে চাপা পড়ে যায়। সহিংসতা, ভয় আর মৃত্যু যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক সহনশীলতার অভাব, অর্থনৈতিক চাপ, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার প্রসার—সবকিছুই ভূমিকা রাখছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা হচ্ছে মানুষের ভেতরে। মানুষ ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে।

আজ দূরদেশে বসেও মনে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনীতি, রাজনীতি বা আইনশৃঙ্খলা নয়; সবচেয়ে বড় সংকট মানুষের ভেতরের নিরাপত্তাবোধ হারিয়ে যাওয়া। যখন একটি দেশের মানুষ প্রতিদিন আতঙ্কের খবর নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে, তখন সেই সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি হয়।
জন্মভূমিকে কেউ ভুলতে পারে না। তাই দূরে থেকেও দেশের জন্য দুশ্চিন্তা হয়, ভয় হয়, কষ্ট হয়। আর প্রতিদিন খবরের কাগজ খুলে শুধু একটি প্রার্থনাই মনে আসে—দেশটা যেন আবার এমন এক জায়গায় ফিরে যায়, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তার মানবিকতা, আতঙ্ক নয়।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১১ মে ২০২৬