ঢাকার বসুন্ধরার জমি নিয়ে নতুন হিসাব, সরকারি ২২২ বিঘা চিহ্নিত
ঢাকা প্রতিনিধি, ১১ মে:
রাজধানীর অন্যতম অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা নিয়ে এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি জমির প্রশ্ন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের ভেতরে প্রায় ২২২ বিঘা সরকারি জমি রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলাকাটিকে পুরোপুরি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার কার্যক্রমও জোরদার করেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজউকের অনুমোদিত নথিপত্র ও প্রকল্পের বাস্তব জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখা হলে বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ে। অনুমোদনে যেখানে প্রায় ৩ হাজার ৩১৪ একরের হিসাব পাওয়া গেছে, সেখানে বাস্তবে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের আওতায় রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০৪ একর জমি। এই অতিরিক্ত অংশের মধ্যেই সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জমির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
সরকারি পর্যায়ের একটি সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ভাটারা, বাড্ডা, খিলক্ষেত ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার অন্তর্গত একাধিক মৌজায় ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্রকল্প বিস্তৃত হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত জমির মধ্যে কিছু অংশ খাসজমি হিসেবে সরকারের মালিকানাধীন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ডিএনসিসির অধীনে আনার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর রাজউক ও মন্ত্রণালয়ের যৌথ টিম মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।
এদিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় বিভিন্ন ধরনের ফি আদায়ের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আগামী সোমবার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালে সর্বশেষ যে ম্যাপ ও জিআইএস ডাটাবেস জমা দেয়, সেখানে তাদের মোট জমির পরিমাণ ১০ হাজার ২১৩ বিঘার বেশি উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যেই সরকারের প্রায় সাড়ে ২২২ বিঘা জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে শর্তসাপেক্ষে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের লে-আউট অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালে সরকারি জমি বাদ দিয়ে প্রায় ৯ হাজার ৯০৫ বিঘা জমির ওপর প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, শুধু বসুন্ধরা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল হওয়া সরকারি জমি আইন অনুযায়ী উদ্ধার করা হবে। তিনি বলেন, “যেখানে খাসজমি আছে, সেগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। আইনগত প্রক্রিয়ায় সবকিছু দেখা হবে।”
এদিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নাগরিক সুবিধা, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন অবকাঠামো ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজউক থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এলাকাটিতে সেবা প্রদান, কর আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সিটি করপোরেশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে বসুন্ধরার বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ মনে করছেন, সিটি করপোরেশনের অধীনে গেলে নাগরিক জবাবদিহি বাড়বে। আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিনের স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা বদলে গেলে সেবার মান ও নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে ২০টি ব্লকে বিভক্ত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৩৫ হাজারের বেশি প্লট রয়েছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো, আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে এটি ঢাকার অন্যতম পরিচিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এবার সেই পরিকল্পিত নগরীর ভেতরেই সরকারি জমির হিসাব নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কীভাবে এত বছর পর এই অমিল সামনে এলো, আর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কোন পথে এগোয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।