ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প।। ২৮।। নাঈম আজ নেই কেন?

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প।। ২৮।। নাঈম আজ নেই কেন?

নাঈম আজ নেই কেন?

উৎসর্গ
নাঈমের স্মৃতির প্রতি।
যার হাতে কোরআন থাকার কথা ছিল,
অথচ যার জন্য আজ একটি পরিবার শুধু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায়

গ্রামের নাম ‘মোশন গ্রাম’। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলায় অবস্থিত গ্রামটি। সেই গ্রামের একটি ছোট্ট টিনের ঘরে থাকেন শেখ বাবু। পেশায় রিক্সা চালক। তার স্ত্রীর নাম নাজমা বেগম। এই দম্পতির দুটি ছেলে। ছেলেগুলেঅ খুবই মিষ্টি দেখতে। বড়টির নাম মো: নাঈম শেখ আর ছোটটির নাম মো: নাজমুল শেখ। 

ওদের সংসারে অভাব আছে।  কিন্তু  স্বপ্নের অভাব নেই।

শেখ বাবু চান, তার বড় ছেলে একদিন কোরআনের হাফেজ হবে। মানুষ তাকে সম্মান করবে। তিনি নিজে হয়তো সারাজীবন রিকশার প্যাডেল ঘোরাবেন। কিন্তু ছেলের হাতে থাকবে কোরআন।

সেই স্বপ্ন নিয়েই বছরখানেক আগে নাঈমকে ভর্তি করা হয় ঢাকার কদমতলী থানার রায়েরবাগ জোড়াখাম্বা এলাকার রওজাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। কিছুদিন পর ছোট ভাই নাজমুলও সেখানে ভর্তি হয়।

প্রথম দিকে নাঈমের কণ্ঠে আনন্দ থাকে।

ফোনে বলে,

—"মা, আজ নতুন সূরা মুখস্থ করেছি।"

নাজমা বেগমের মুখে তখন হাসি ফোটে।

কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই ছেলের কণ্ঠ বদলে যায়।

এক রাতে সে খুব আস্তে বলে,

—"মা, ভুল হলে খুব মারে।"

নাজমা ভাবেন, ছেলে হয়তো বাড়ির জন্য কাঁদছে।

তিনি বলেন,

—"আর একটু ধৈর্য ধর বাবা। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।"

নাঈম চুপ করে যায়।

সেই নীরবতার ভাষা তখন কেউ পড়তে পারে না।

৩ আগস্ট। দুপুর।

রিকশা চালাতে চালাতেই শেখ বাবুর মোবাইলে ফোন আসে।

"আপনার ছেলে অসুস্থ। দ্রুত চলে আসুন।"

তার বুক ধক করে ওঠে।

তিনি ছুটে যান।

রায়েরবাগে পৌঁছে মানুষের মুখের দিকে তাকান।

সব মুখ নিস্তব্ধ।

সব চোখ নিচের দিকে।

শেষ পর্যন্ত একজন বলে,

—"বাথরুমে... ফাঁসি দিয়েছে।"

শেখ বাবুর পৃথিবী যেন থেমে যায়।

তিনি দৌড়ে যান।

কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের করিডোরে ছেলের মরদেহের পাশে বসে নাজমা বেগম কাঁদেন।

তিনি ছেলের হাঁটুর নিচে দাগ দেখেন।

হাতে বেতের আঘাতের মতো চিহ্ন দেখেন।

তিনি বারবার বলেন,

"আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না। আমার সন্তানকে মেরে ফেলা হয়েছে।"

তার কান্না করিডোরের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খায়।

কেউ উত্তর দেয় না।

কদমতলী থানার উপপরিদর্শক সাদ্দাম হোসেন শরীরের দাগগুলো দেখেন।

তিনি কাউকে দোষী বলেন না।

শুধু বলেন,

"ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।"

আইনের ভাষা সংযত।

কিন্তু মায়ের কান্না সংযত হয় না।

বাবার অপেক্ষাও নয়।

সেই রাতে মোশন গ্রামে ঘুম নামে না।

মসজিদে দোয়া হয়।

মানুষ নীরবে বসে থাকে।

শেখ বাবু ছেলের কোরআন শরিফ বুকে জড়িয়ে বসে থাকেন।

একটি পাতার ভাঁজে লেখা—

"রব্বি জিদনী ইলমা।"

হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।

বাকিটা আর লেখা হয় না।

কয়েক দিন পর ছোট ভাই নাজমুল বাড়ি ফিরে আসে।

সে মাকে জড়িয়ে ধরে।

ধীরে বলে,

"মা, ভাইয়া তো আর আসবে না?"

নাজমা বেগম কোনো উত্তর দিতে পারেন না।

কিছু প্রশ্নের উত্তর ভাষায় দেওয়া যায় না।

আজও তদন্ত চলছে।

আজও প্রশ্ন বেঁচে আছে।

কেউ বলছে আত্মহত্যা।

কেউ বলছে হত্যা।

চূড়ান্ত সত্য উদ্ঘাটনের দায় তদন্তের।

কিন্তু একটি প্রশ্ন তদন্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে।

নাঈম আজ নেই কেন?

এই প্রশ্ন শুধু একটি শিশুর মৃত্যুর কারণ জানতে চায় না। এই প্রশ্ন একটি বাবার ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের হিসাব চায়। একটি মায়ের বুকফাটা কান্নার জবাব চায়। একটি শিশুর অসমাপ্ত হিফজের ব্যাখ্যা চায়। একটি নিরাপদ শিক্ষাঙ্গনের নিশ্চয়তা চায়।

যেদিন এই প্রশ্নের সৎ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত উত্তর মিলবে, সেদিন হয়তো একটি মামলার নিষ্পত্তি হবে।

কিন্তু বাবা-মা আর ভাইয়ের মনে ঐ প্রশ্ন বারবারই ঘুরপাক খেতে থাকবে "নাঈম আজ নেই কেন’’ এক অনন্ত প্রশ্ন হয়ে।

লন্ডন, ৮ আগস্ট