ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
আইপিওতে শত কোটি টাকা, এখন ৩৫ কোম্পানির কারখানায় তালা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৯ আগস্ট:
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) তালিকাভুক্ত হলেও উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই—এমন কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আইপিওর মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের পর বছরের পর বছর ব্যবসা বন্ধ রাখা, লভ্যাংশ না দেওয়া এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশে অস্বচ্ছতার অভিযোগে এসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
ডিএসইর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এক্সচেঞ্জটিতে মোট তালিকাভুক্ত ইকুইটি কোম্পানির সংখ্যা ৩৬০টি। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১৬০টি, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৭৪টি এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১২৬টি কোম্পানি। ঝুঁকিপূর্ণ ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর মধ্যেই রয়েছে উৎপাদনহীন বা নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার অনেক সময় গুজব ও কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাই নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলোর তালিকা প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদ করে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করছে ডিএসই।
দুই দশক ধরে বন্ধ প্রতিষ্ঠানও আছে
নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলোর তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় দুই দশক ধরে নিষ্ক্রিয়। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম ২০০২ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে।
প্রকৌশল খাতের বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডসও ২০১৬ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
তবে ৩৫টি নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সংকটে পড়ে। করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, জ্বালানি সমস্যা, ঋণের চাপ এবং ব্যবস্থাপনা সংকট—বিভিন্ন কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম থেমে যায়।
গ্যাস সংকটে হামিদ ফেব্রিক্স
বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান হামিদ ফেব্রিক্স উৎপাদন বন্ধের অন্যতম সাম্প্রতিক উদাহরণ। পর্যাপ্ত চাপের গ্যাস না পাওয়া এবং বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সিএনজি বা এলএনজি ব্যবহার ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের জুনে লে-অফ ঘোষণা করে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটির।
বিদ্যুৎ খাতেও দেখা গেছে একই ধরনের সংকট। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, বারাকা পাওয়ার ও জিবিবি পাওয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির পাওনা সময়মতো না পাওয়ার কারণে উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য খাতের রহিমা ফুড করপোরেশন বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মানসম্মত কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় নারকেল তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট বন্ধ করে দেয়।
ঋণের বোঝা ও ব্যবস্থাপনা সংকট
বাজারসংশ্লিষ্টদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া বেশিরভাগ কোম্পানির সংকটের পেছনে রয়েছে চলতি মূলধনের ঘাটতি, বিপুল ব্যাংকঋণ, সুদের চাপ, পুরোনো ও অকার্যকর যন্ত্রপাতি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগও সংকটকে আরও গভীর করেছে। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরও অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর তালিকাভুক্ত অবস্থায় থাকায় বিনিয়োগকারীদের অর্থ আটকে পড়ছে।
সর্বশেষ বড় ধাক্কা এসেছে প্রকৌশল খাতের এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডে। ব্যাংকিং জটিলতার কারণে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারা এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে।
কাগুজে কোম্পানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেটির শেয়ারে অর্থ বিনিয়োগ করেন ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ মুনাফার প্রত্যাশায়। কিন্তু কোনো কোম্পানি দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ রাখলেও যদি তার শেয়ার বাজারে লেনদেন চলতে থাকে, তখন সেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষ করে নিষ্ক্রিয় কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়ানো এবং পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে এসব শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
শুধু ‘জেড’ ক্যাটাগরি নয়, দরকার কঠোর ব্যবস্থা
ডিএসই ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিষ্ক্রিয় কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও কৃত্রিম লেনদেন ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে অকার্যকর কোম্পানিকে মূল বাজার থেকে আলাদা করা এবং তালিকাভুক্তির নিয়ম আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া বা সতর্কবার্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে এনে পুনর্গঠন, নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে মালিকানা হস্তান্তর কিংবা প্রয়োজন হলে চূড়ান্তভাবে ডি-লিস্টিংয়ের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ, একটি কোম্পানি যখন বছরের পর বছর উৎপাদন করে না, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয় না এবং স্বচ্ছ আর্থিক তথ্যও প্রকাশ করে না, তখন শুধু তার শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত থাকার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
৩৬০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজারে ৩৫টি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া তাই শুধু কয়েকটি কোম্পানির সমস্যা নয়; এটি দেশের পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় সংকেত।