লন্ডনে বাংলাদেশি প্রবীণদের আবাসন বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা
হাউস অব লর্ডসে উন্মোচিত “আমার বাড়ি, আমার জীবন”
লন্ডন, ১২ ফেব্রুয়ারি: পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রবীণদের আবাসন বাস্তবতা নিয়ে পরিচালিত বহুল প্রতীক্ষিত গবেষণা প্রতিবেদন “আমার বাড়ি, আমার জীবন” আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মর্যাদাপূর্ণ হাউস অব লর্ডসের চোলমন্ডেলি রুমে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লর্ড বেস্ট, OBE, DL। তিনি গবেষণাটিকে “অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক” আখ্যা দিয়ে বলেন—
“এটি এমন একটি কাজ, যা সিভিল সার্ভেন্ট ও মন্ত্রীদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এই গবেষণা বাস্তব ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে সক্ষম।”

তিন বছরব্যাপী গবেষণা: কারা ছিল অংশীদার
ভিভেনসা ফাউন্ডেশনের কমিশনে পরিচালিত এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় অংশ নেয়:
- দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি
- বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন
- হাউজিং লার্নিং অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট নেটওয়ার্ক (Housing LIN)
গবেষণায় টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, হ্যাকনি ও রেডব্রিজে বসবাসরত ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ৭৬ জন বাংলাদেশি নারী-পুরুষের গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার মূল চিত্র: আজীবন বৈষম্যের ভার বার্ধক্যে আরও গভীর
গবেষণাটি দেখিয়েছে—
বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেক প্রবীণ আজীবন আবাসন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, আর বার্ধক্যে এসে সেই বৈষম্য আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে:
- শারীরিক স্বাস্থ্য
- মানসিক সুস্থতা
- সামাজিক কেয়ার
- পারিবারিক সম্পর্ক
- সামগ্রিক জীবনমান
অনেক প্রবীণ এমন ঘরে বসবাস করছেন, যা তাদের বয়সজনিত শারীরিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা চলাফেরার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্যাঁতসেঁতে ঘর, বাতাসহীনতা, হিটিং সমস্যা—ঝুঁকির তালিকা দীর্ঘ
বিশেষ করে সোশ্যাল হাউজিং ও প্রাইভেট ভাড়া বাসায় বসবাসকারীদের মধ্যে পাওয়া গেছে:
- স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ
- পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাব
- হিটিং সমস্যার পুনরাবৃত্তি
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব কারণে শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ছে।
‘কার্যকরী অতিরিক্ত ভিড়’: যৌথ পরিবারে গোপনীয়তার সংকট
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কার্যকরী অতিরিক্ত ভিড় বা overcrowding।
বাসস্থানগুলো একক পরিবারের ধারণায় নির্মিত হলেও বাস্তবে অনেক বাংলাদেশি পরিবার যৌথ বা মাল্টি-জেনারেশনাল কাঠামোয় বসবাস করে। এর ফলে:
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব
- পারিবারিক টানাপোড়েন
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা
এসব সমস্যা প্রবীণদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সহায়তা চাইলে ধীর সাড়া—ভাষাগত বাধায় আরও জটিলতা
অনেক প্রবীণ অভিযোগ করেছেন:
- কাউন্সিল বা বাড়িওয়ালার কাছে সহায়তা চাইলে সাড়া ধীর বা অনুপযুক্ত
- ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা
- প্রশাসনিক জটিলতা
ফলে অনেকেই আবেদন করা থেকে বিরত থাকেন এবং অনুপযুক্ত, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই বসবাস চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপর কেয়ারের চাপও বৃদ্ধি পায়।
গবেষকদের বক্তব্য
মানিক গোপীনাথ, সিনিয়র লেকচারার, দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি এবং গবেষণার প্রধান গবেষক বলেন—
“দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক বাংলাদেশিরা বার্ধক্য ও আবাসন–সংক্রান্ত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে অদৃশ্য থেকেছেন। এই গবেষণা তাদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে এনে দেখিয়েছে—বৈষম্য কেবল বিদ্যমান নয়, বরং তা প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে অনুভূত হয় এবং আজীবন বঞ্চনার পরিণতি হিসেবে কীভাবে প্রকাশ পায়।”
বশির উদ্দিন, সিইও, বাংলা হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন বলেন—
“গবেষণা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। এটি একটি স্পষ্ট কল টু অ্যাকশন। বিদ্যমান ঘরগুলোকে বসবাসযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় অভিযোজন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন নির্মাণে বড়, পরিবার–উপযোগী বাসস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।”
নীতিনির্ধারকদের জন্য সুপারিশ
গবেষণাটি নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কয়েকটি সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছে:
- জাতিগত ও বয়সভিত্তিক বিভাজিত আবাসন তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ
- প্রবীণদের জন্য বাসায় বিশেষ সুবিধা সংযোজনের পথে বৈষম্যমূলক বাধা দূর করা
- মাল্টি-জেনারেশনাল বসবাসকে বৈধ আবাসন পছন্দ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
- আবাসনকে স্বাস্থ্য ও সামাজিক কেয়ারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে—
২০৫০ সালের আবাসনের প্রায় ৮০% ইতোমধ্যেই বিদ্যমান, তাই এখনই বিদ্যমান ঘরগুলোকে নিরাপদ, প্রবেশগম্য ও বয়স-উপযোগী করে তোলা জরুরি।
অন্যথায় আবাসন বৈষম্য ভবিষ্যতে জাতিগত, স্বাস্থ্য ও কেয়ার–সংক্রান্ত বৈষম্যকে আরও গভীর করবে।
সব মিলিয়ে, “আমার বাড়ি, আমার জীবন” শুধু একটি গবেষণা প্রতিবেদন নয়—
এটি পূর্ব লন্ডনের প্রবীণ বাংলাদেশি কমিউনিটির জীবনসংগ্রামের এক মানবিক দলিল।
গবেষণাটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে:
উপযুক্ত আবাসন ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ ও সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।