‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

চলে গেলেন ষাট দশকের চলচ্চিত্র নায়িকা নাসিমা খান

চলে গেলেন ষাট দশকের চলচ্চিত্র নায়িকা নাসিমা খান

বিনোদন ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ১৩ অক্টোবর:

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের ষাটের দশকের পরিচিত মুখ, একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা নাসিমা খান আর নেই। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিখোঁজ ছোট ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে দিন কাটছিল তাঁর। কোথায় আছে ছেলে, কেমন আছে—এই দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। সন্তানের ফেরার অপেক্ষা আর বুকভরা উৎকণ্ঠার মধ্যেই রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

মৃত্যুর প্রায় সাত দিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। জীবনের একসময় রুপালি পর্দায় যাঁর উপস্থিতি দর্শকের মনোযোগ কেড়েছিল, সেই অভিনেত্রীর শেষ অধ্যায় কেটেছে ব্যক্তিগত বেদনা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যুক্ত এক শিল্পীর দীর্ঘ জীবনের অবসান ঘটল।

১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নাসিমা খানের। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী। পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। তাঁর দাদা খান বাহাদুর আবদুল জলিল খান বিক্রমপুর থেকে ঢাকায় এসে বসতি গড়েন এবং ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংস্কৃতিমনস্ক এক যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠেন নাসিমা। পড়াশোনা করেন কামরুন্নেসা স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই নাচ শেখার পাশাপাশি বই পড়ার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। স্কুলছাত্রী থাকতেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। তবে পরিবারের শর্ত ছিল, অভিনয়ের কারণে পড়াশোনায় অবহেলা করা যাবে না।

চলচ্চিত্রে অভিষেক ও নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ

নাসিমা খানের চলচ্চিত্রে আসার পেছনে অভিনেতা ও নির্মাতা খান আতাউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি আনিস নামেও পরিচিত ছিলেন এবং নাসিমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকতেন। নাসিমার বাবার সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর পরামর্শে পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর অভিনয়জগতে প্রবেশ করেন নাসিমা।

১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। একই বছর বেবী ইসলাম পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘তানহা’য় অভিনয় করেন। এরপর ১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার পাশাপাশি লাহোরের উর্দু চলচ্চিত্রেও কাজ করেন তিনি।

অভিনয় শেখার জন্য সে সময় প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত ছিল। তাই অভিজ্ঞ শিল্পী ও পরিচালকদের কাছ থেকে কাজ শিখতেন নাসিমা। নিজের উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি উন্নত করতে খান আতাউর রহমান তাঁকে জোরে জোরে কবিতা আবৃত্তি এবং গল্প পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসও তাঁর অভিনয়জীবনে সহায়ক হয়েছিল।

নায়িকা হিসেবে অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র

  • যে নদী মরু পথে (১৯৬১)
  • কার বউ (১৯৬৬)
  • উজালা (১৯৬৬)
  • বেগানা (১৯৬৬)
  • আপন দুলাল (১৯৬৬)

১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কার বউ’ ছিল নাসিমা খানের অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর একটি। নিজের স্মৃতিচারণে তিনি জানিয়েছিলেন, ছবিটিতে তিনিই ছিলেন একমাত্র নায়িকা। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন হারুন, গোলাম মুস্তাফা ও সুভাষ দত্তসহ একাধিক অভিনেতা।

ছবিটির শুটিংয়ে একটি বিপজ্জনক ঘটনার মুখোমুখি হন নাসিমা। স্বামীর দুর্ঘটনার খবর শুনে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণের সময় পরিচালক নজরুল ইসলাম তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন। অপ্রস্তুত অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে আহত হন তিনি। দৃশ্যটি ভালোভাবে ধারণ হওয়ায় ক্যামেরার পেছনে হাততালি পড়লেও আঘাত ও আকস্মিক ঘটনায় মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন অভিনেত্রী। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী তিন দিন তিনি ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারেননি।

অন্যান্য চরিত্রে অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র

  • জাগো হুয়া সাভেরা (১৯৫৯)
  • তানহা (১৯৫৯)
  • সূর্যস্নান (১৯৬২)
  • ধারাপাত (১৯৬৩)
  • নাচঘর (১৯৬৩)
  • শাদি (১৯৬৪)
  • মালান (১৯৬৪)
  • পারভানা (১৯৬৬)
  • উলঝন (১৯৬৭)
  • দুই ভাই (১৯৬৮)
  • গৌরী (১৯৬৮)
  • নেই লায়লা নেইয়া মজনু (১৯৬৯)
  • গীত কহিঁ সঙ্গীত কহিঁ (১৯৬৯)
  • ঢেউয়ের পরে ঢেউ (১৯৭০)
  • আঁসু বন গয়ে মোতি (১৯৭০)
  • রং বদলায় (১৯৭০)
  • আমার বউ (১৯৭১)
  • দাসী (১৯৭২)

এ ছাড়া তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকায় ‘ঢেউ এর ঢেউ’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘মাতৃত্ব’ ও ‘ক্ষুধা’র মতো ছবির নামও পাওয়া যায়। বিভিন্ন চলচ্চিত্রের তথ্যভান্ডারে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা ও মুক্তির সাল সম্পর্কে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই ওপরের তালিকাকে তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের সংকলন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত; সব ছবিতে তাঁর চরিত্র নায়িকা নাকি পার্শ্বচরিত্র—তা প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

‘সূর্যস্নান’-এর শুটিংয়েও কঠিন অভিজ্ঞতা

১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ চলচ্চিত্রে দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন নাসিমা। তাঁর বিপরীতে ছিলেন আনোয়ার হোসেন। একটি আবেগঘন দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে আনোয়ার হোসেন পরিচালককে নায়িকা বদলে ফেলার কথা বলেছিলেন। এতে আরও ঘাবড়ে যান নাসিমা। তবে পরিচালকের নির্দেশনা ও বারবার চেষ্টার পর দৃশ্যটি ধারণ করা সম্ভব হয়। পরে ছবিটি প্রশংসিত হলে অভিনয়ের প্রতি তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁর স্মৃতিচারণের বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ। ১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আত্মকথনে নিজের অভিনয়জীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণ পরে বাংলা মুভি ডেটাবেজে পুনঃপ্রকাশিত হয়।

নাসিমার স্মৃতিতে তৎকালীন চলচ্চিত্রাঙ্গনের আরেকটি দিকও উঠে এসেছে। শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কে কতটা পর্দায় জায়গা পেলেন, তার চেয়ে চরিত্রটি কত ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা গেল, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো বলে তিনি স্মরণ করেছিলেন।

লাহোরের চলচ্চিত্র ছেড়ে ঢাকায় ফেরা

ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে কাজ করে পরিচিতি পাওয়া নাসিমা খান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের টানে ঢাকায় ফিরে আসেন। লাহোরে প্রতিষ্ঠিত অভিনয়জীবন থাকলেও তিনি সেখানে থেকে যাননি। স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রের পরিবেশ বদলে গেলে অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে সরে যান।

১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্রজগতের বাইরের একজনকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর সংসার ও দুই সন্তানকে ঘিরে তাঁর জীবন আবর্তিত হতে থাকে। ১৯৭৯ সালে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে আবার পর্দায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে নাটকেও কাজ করেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যায়।

তাঁর অভিনীত টেলিভিশন নাটকের পূর্ণাঙ্গ নাম ও সালভিত্তিক তালিকা নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি। তাই যাচাইহীন নাটকের নাম যুক্ত না করে চলচ্চিত্রের তালিকাই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

চলচ্চিত্র থেকে নাটকে

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও কাজ করেছেন নাসিমা খান। তবে তাঁর অভিনীত নাটকের পূর্ণাঙ্গ, সালভিত্তিক তালিকা নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত সূত্রে পাওয়া যায়নি। তাই নাটকের নাম ও সাল অনুমান করে যুক্ত করা সমীচীন হবে না।

চলচ্চিত্রে দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ছবিতে তাঁকে দেখা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এটিকে তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্রে উপস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নাসিমা খান

নাসিমা খানের অভিনয়জীবন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ সেই সময়ের ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পের বহুভাষিক পরিবেশের সাক্ষ্য বহন করে।

তাঁর প্রজন্মের শিল্পীরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অভিনয় শিখেছেন, নিজেরাই অনেক কঠিন দৃশ্যে অংশ নিয়েছেন এবং অভিজ্ঞদের কাছ থেকে কাজের কৌশল আয়ত্ত করেছেন। নাসিমা খানের স্মৃতিচারণে সেই সময়ের শুটিং, শিল্পীদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অভিনয় শেখার অভিজ্ঞতার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

জীবনের শেষদিকে নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা তাঁকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রেখেছিল। সেই ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যেই ৮২ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটল। রেখে গেলেন বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে কাজের দীর্ঘ স্মৃতি এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষ্য।

তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র সংরক্ষণ, স্মৃতিচারণ পুনঃপ্রকাশ এবং সমকালীন শিল্পীদের সাক্ষ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নাসিমা খানের অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব।