লাল–সবুজের চূড়ান্ত বিজয়: গৌরব, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যতের শপথ

লাল–সবুজের চূড়ান্ত বিজয়: গৌরব, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যতের শপথ

আজ ১৬ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হয়েছিল বিশ্বমানচিত্রে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল চূড়ান্ত বিজয়। গৌরব, আনন্দ আর অগণিত শহীদের আত্মদানের বেদনা মিলেমিশে আজ জাতি উদ্‌যাপন করছে মহান বিজয়ের এই ঐতিহাসিক দিন।

ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে, তা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধিকারের প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ ধাপে ধাপে রূপ নেয় স্বাধীনতার সংগ্রামে। সেই সংগ্রাম চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ট্যাংক, কামান ও মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইতিহাসে বিরল সেই গণহত্যার রাত থেকেই শুরু হয় বাংলার সশস্ত্র প্রতিরোধ।

সেই ভয়াল রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানান। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক—যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কোনো প্রশিক্ষণ, উন্নত অস্ত্র কিংবা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছাড়াই বাংলার দামাল ছেলেরা জীবনকে তুচ্ছ করে অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ নয় মাসের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, সম্ভ্রম হারান দুই লাখ মা-বোন, ধ্বংস হয় অগণিত ঘরবাড়ি ও সম্পদ। এই অপরিসীম আত্মত্যাগের বিনিময়েই আসে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণীতে জাতিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়—অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বাণীতে বলেন, এবারের বিজয় দিবস হোক জাতীয় জীবনে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের নবযাত্রা শুরু হয়েছে, তা যে কোনো মূল্যে রক্ষার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, স্বৈরাচার ও অপশাসনের কারণে স্বাধীনতার আলো বহুবার ম্লান হয়েছে, তবে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিজয়ের পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে—এই প্রশ্নে বিশিষ্ট চিন্তাবিদরা আত্মসমালোচনার তাগিদ অনুভব করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, একাত্তরের যুদ্ধজয়ী জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব জনগণকে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি, যার ফলে জাতীয়তাবাদের পরীক্ষাও এখনো শেষ হয়নি। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, ১৯৭১ ছিল শ্রেণি, জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যবিরোধী দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর মতে, বুদ্ধিবৃত্তির মুক্তি ও জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ জাগ্রত না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

তবু সব সীমাবদ্ধতা ও প্রশ্নের মধ্যেও বিজয় দিবস বাঙালির চিরগৌরবের দিন। এদিন ভোর থেকেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে নামে মানুষের ঢল। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টাবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ ফুল হাতে শ্রদ্ধা জানান শহীদদের। লাল-সবুজ পতাকায় ছেয়ে যায় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ।

দিবসটি উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উদ্যোগে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। রাজধানীসহ সারা দেশে মুক্তির গান বাজবে, পাড়ামহল্লা ও যানবাহনে উড়বে লাল-সবুজ পতাকা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমজীবী ও পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পালন করছে নানা কর্মসূচি। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমি ও ছায়ানটসহ নানা সংগঠনের আয়োজনে দিনভর আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

মহান বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আজকের শপথ। লাল-সবুজের এই বিজয় আমাদের চিরপ্রেরণা—স্বাধীনতার আলো যেন আর কখনো ম্লান না হয়।