ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২ ।। রূপার রুপালী স্বপ্ন
উৎসর্গ
বস্তিবাসী অগণিত রূপাদের, যাঁদের ঘামে উপরতলার বাসিন্দারা আয়েশী জীবনযাপন করছেন

।। রূপার রুপালী স্বপ্ন।।
ঢাকার দুষিত বাতাসে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। আজও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর খেতাব ধরে রেখেছে ঢাকা। এদিকে আজকে গরমও পড়েছে প্রচন্ড। শাহজাহানপুর কাঁচাবাজারের রেললাইনের পাশের বস্তিতে তখন চুলার ধোঁয়া উঠতে শুরু করে।
রূপা দরজার সামনে বসে আছে। তার শ্বাস টানতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে। তার হাতে একটি পুরোনো খাতা। খাতাটা সে প্রায়ই খুলে। আবার বন্ধ করে। তারপর আবার খুলে।

আমার নাম রূপা
খাতার উপর প্রথম পাতায় লেখা—
“আমার নাম রূপা।”
এই চারটি শব্দ তার খুব প্রিয়।
কারণ এই চারটি শব্দ সে নিজে পড়তে পারে।
মা পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে,
—কী করস?
—কিছু না।
—খাতা দেখলে পেট ভরব? আমার আবার মানসের বাসায় কাজে যাইতে অইবো...
রূপা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে।
মা হাসে না।
মায়ের চোখে সব সময় একটা ক্লান্তি লেগে থাকে।
সকালে মানুষের বাসায় কাজ। দুপুরে অন্য বাসা। রাতে নিজের ঘর।
হাসার ‘মন’ বা হাসার মতো সময়ই-বা কোথায়?
রূপা আগে একটা এনজিও স্কুলে যেত। ছোট্ট স্কুল। দেয়ালে রঙিন ছবি। টিনের ঘর। টিনের চাল। টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে রূপার কি যে ভাল লাগতো তা বলে বোঝানোর নয়। তখন অনেক সময় রূপা দুষ্টামি করে ছড়া কাটতো—
‘টিনের চালে বৃষ্টি
সেইদিকে সবার দৃষ্টি
লাগবে মোদের পুষ্টি’
নইলে হবো না তুষ্টি’।
আবার কখনো ছড়া কাটতো,
‘টিনের চালে কাউয়া
সবাই যামু মাউয়া’
বলাবাহুল্য, রূপা এভাবে সব সময়ই তাৎক্ষণিকভাবে ছড়া বানিয়ে স্কুলের সহপাঠি, এমনকি শিক্ষকদের অবাক করে দিতো। সারাক্ষণ সে ছড়ায় ছড়ায় কথা বলতে চাইতো। স্কুল থেকে তার বানানো ‘টিনের চালে কাউয়া/সবাই যামু মা্উয়া’ শুনে শিক্ষক খুবই মুগ্ধ হন। চাঁদা তুলে শিক্ষকরা মাওয়া ফেরিঘাটের কাছে এক চমৎকার লোকেশনে পিকনিক করতে নিয়ে গিয়েছিলেন সব ছাত্রছাত্রীকে। রূপার সেই দিনগুলোর কথা মনে হচ্ছে আজ। তার চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা অশ্রুকণা টলমল করে উঠলো বলে মনে হলো।
স্কুলে আপা বলতেন,
—বড় হইয়া কী হবা?
সবাই নানা উত্তর দিত।
কেউ ডাক্তার।
কেউ পুলিশ।
কেউ শিক্ষক।
রূপা বলত,
—আমি বই লিখমু।
সবাই হেসে উঠত।
আপা হাসতেন না।
তিনি বলতেন,
—বই লিখতে পারলে অনেক মানুষের জীবন বদলাইতে পারবা।
সেই স্কুল এখনো আছে।
কিন্তু রূপার যাওয়া হয় না।
ছোট ভাইকে দেখাশোনা করতে হয়।
মাঝে মাঝে পাশের বাসায় থালাবাসনও ধুতে হয়। এমনকি মা হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়লে মায়ের হয়ে ‘বদলি’ কাজের বুয়া হতে হয় মাঝেমধ্যে। এতে কিছু টাকা আসে। টাকাটা সংসারে লাগে।
আজ বিকেলে স্কুল ছুটির সময় কয়েকজন ছেলে-মেয়ে রাস্তা দিয়ে যায়।
তাদের কাঁধে ব্যাগ।
হাতে বই।
রূপা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
একজন মেয়ের খাতা মাটিতে পড়ে যায়।
রূপা দৌড়ে গিয়ে তুলে দেয়।
মেয়েটি বলে,
—ধন্যবাদ।
তারপর চলে যায়।
রূপা কিছুক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নতুন খাতার একটা আলাদা গন্ধ আছে।
সে গন্ধ তার খুব ভালো লাগে।

রাতে আকাশে চাঁদ ওঠে। টিনের চালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে ঢুকে পড়ে। রূপা খাতাটা খুলে বসে। শেষ সাদা পাতায় ধীরে ধীরে লিখতে থাকে। অক্ষরগুলো কাঁপে। লাইন বেঁকে যায়। তবু সে লিখে।
“আমি আবার ইশকুলে যামু।”
লেখা শেষ করে সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়, এই কথাটা সে কাগজে নয়, আকাশে লিখেছে।
ঠিক তখনই মা ডাকে,
—রূপা, ঘুমা। ভোরে উঠতে হইব।
রূপা খাতা বন্ধ করে।
চাঁদের আলো তার মুখে পড়ে।
মুখটা উজ্জ্বল দেখায়।
যেন তার নামের মতোই রুপালী।
রূপার এই রুপালী স্বপ্ন একদিন সত্যি হবে, নাকি টিনের চালের ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলোর মতোই হারিয়ে যাবে—সেই উত্তর কি কোথাও লেখা আছে?
লন্ডন, ৭ জুন ২০২৬