দেশে এবারের ঈদ যাত্রায় সড়কে নিহত ২৮১, আহত ৮৩৭ আদম সন্তান!
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৫ জুন:
ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার উচ্ছ্বাস। কিন্তু এবারের ঈদুল আজহার যাত্রাপথও রক্তাক্ত স্মৃতির সাক্ষী হয়ে থাকল। ঘরে ফেরার পথে কিংবা কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮১ জন মানুষ। আহত হয়েছেন আরও ৮৩৭ জন। তারা কেউ পরিসংখ্যানের সংখ্যা নন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন কারও সন্তান, বাবা, মা, ভাই, বোন কিংবা জীবনের একমাত্র অবলম্বন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ঈদের আগে ও পরে ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত ১৩ দিনে সারা দেশে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু দুর্ঘটনার হিসাব নয়, অসংখ্য পরিবারের আজীবনের বেদনার ইতিহাস।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। ১৪১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট নিহতের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এছাড়া পথচারী, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের মৃত্যুও উদ্বেগজনক। ঈদের আনন্দে ঘরে ফেরা কিংবা জীবিকার তাগিদে পথে নামা অনেক মানুষ আর কখনো তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর একটি। এসব মৃত্যু শুধু সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়; এগুলো এমন সব পরিবারের কান্না, যাদের ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো এখনো সড়কের বড় শত্রু হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ও মানসম্মত গণপরিবহনের অভাবও মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাধ্য করছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছরের তুলনায় প্রাণহানির সংখ্যা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক বলা যাচ্ছে না। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। ফলে প্রতিটি ঈদের মতো এবারও অসংখ্য পরিবার উৎসবের পোশাকের বদলে কাফনের কাপড় দেখেছে।
বাংলাদেশে ঈদের সময় কোটি কোটি মানুষ যাতায়াত করেন। অথচ প্রতি বছরই সড়ক যেন মৃত্যুর এক অদৃশ্য ফাঁদ হয়ে ওঠে। আমরা নিহত ২৮১ জনকে সংখ্যা হিসেবে দেখি, কিন্তু তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন একজন পূর্ণ মানুষ—একজন আদম সন্তান। তাদের স্বপ্ন ছিল, পরিকল্পনা ছিল, পরিবার ছিল। আজ তারা নেই, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—আর কত ঈদ এভাবে রক্তাক্ত হলে আমরা সত্যিকার অর্থে নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করব?