ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩২ ।। স্বপ্ন ও বাস্তবতার ফারাক: “নিয়ামতে ভরপুর দোজখ”-এর আজকের রূপ
উৎসর্গ
“যে জাতি নিজের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চায়”
আজকের কলামে বর্তমান সময় থেকে ফিরে যাচ্ছি প্রায় সাতশত বছর আগে। কারণ অবশ্য আছে। পুরো লেখাটি পড়তে থাকলে মননশীল পাঠক অনায়াসে ব্যাপারটি ধরতে পারবেন।
মধ্যযুগে বিখ্যাত মরক্কোর পর্যটক ও ইতিহাসবিদ ইবনে বতুতা বাংলা সম্পর্কে একটি স্মরণীয় মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণগ্রন্থ: “রিহলা” (আরবি পূর্ণ নাম: Tuḥfat al-Nuẓẓār fī Gharā’ib al-Amṣār wa ‘Ajā’ib al-Asfār)। অর্থাৎ ইংরেজিতে পরিচিত The Rihla / The Travels of Ibn Battuta।
তিনি তখন পুরো বাংলা ঘুরে দেখেছিলেন। এমনকি সিলেটেও এসেছিলেন। হযরত শাহজালাল (রা) এর সাথেও তাঁর দেখা হয়েছিল। দরবেশ শাহজালাল বতুতাকে তাঁর পরনের একটি ‘জুব্বা’ দান করেছিলেন বলেও ইতিহাসে উল্লেখ আছে। তিনি চতুর্দশ শতকে বাংলায় এসেছিলেন। ঐ গ্রন্থে তিনি চতুর্দশ শতকে বাংলায় তাঁর সফরের অভিজ্ঞতা লিখে গেছেন। সেখানে তিনি বাংলার সম্পদশালী কৃষি, বিশেষ করে ধানের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করেন এবং একই সঙ্গে জলবায়ু, জীবনযাত্রা ও সামাজিক পরিস্থিতিকে কঠোর ও কষ্টকর হিসেবে বর্ণনা করেন—যার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে “নিয়ামতে ভরপুর দোজখ” ধরনের বাক্য জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হিসেবে প্রচলিত হয়। তিনি লিখেছিলেন:
“এটি একটি বিশাল দেশ, ধানে সমৃদ্ধ, পৃথিবীর কোথাও এত সস্তা দ্রব্য আমি দেখিনি; কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি বিষন্ন স্থান। খোরাসানের লোকেরা একে বলত—‘নিয়ামতে ভরপুর দোজখ’ (A Hell Full of Good Things)।”

ইবনে বতুতার এই উক্তির পেছনে কারণও ছিল। বাংলা ছিল উর্বর, সম্পদশালী এবং বাণিজ্যে সমৃদ্ধ। কিন্তু একই সঙ্গে ছিল অতি আর্দ্র আবহাওয়া, দীর্ঘ বর্ষাকাল, দুরূহ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্ভোগ। ফলে সম্পদের প্রাচুর্যের মাঝেও জীবন ছিল কষ্টকর। সেই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নেয় “নিয়ামতে ভরপুর দোজখ” কথাটি।
আজ প্রায় সাতশ বছর পরে প্রশ্ন জাগে—বাংলা কি আবার কোনো নতুন অর্থে “নিয়ামতে ভরপুর দোজখ”-এ পরিণত হচ্ছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি। দেশে সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনে নানা ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বহু পরিবারকে চাপে ফেলেছে। বাজারে গেলে মানুষ বুঝতে পারে, আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয়ের গতি অনেক বেশি। কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষিত তরুণদের হতাশা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতার খবর প্রায়ই শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায় সংঘর্ষ, হত্যা, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অনুভূতি বাড়ছে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প যত বড়ই হোক, নাগরিক যদি নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি না পায়, তাহলে উন্নয়নের সুফল তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না।
কোনো দেশের সাফল্য শুধু অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো তার সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের আস্থা।
ইবনে বতুতার সময়ের বাংলা ছিল সম্পদে ভরপুর কিন্তু জীবনযাপনে কষ্টকর। বর্তমান বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জও অনেকটা সেই ধরনের বৈপরীত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান একদিকে আশাবাদী ছবি আঁকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা অনেক সময় ভিন্ন গল্প বলে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রিক রাজনীতি, বিরোধী মতের প্রতি অনাস্থা, এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক উত্তেজনা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি করছে। নির্বাচন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা জাতীয় ইস্যু—সব ক্ষেত্রেই মতভেদ ও দ্বন্দ্ব অনেক সময় সংলাপের জায়গাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে জনজীবনে; আস্থা ও নিরাপত্তার অনুভূতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলেও তার সঙ্গে সামাজিক শান্তি ও ন্যায়বিচারের অনুভূতি সমানভাবে না মিললে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
“নিয়ামতে ভরপুর দোজখ” শুধু একটি ঐতিহাসিক উক্তি নয়; আজকের প্রেৎক্ষাপটে সাতশত বছর পরে এসেও দেশের জনগন এর সত্যতা খুঁজে পান। কোনো সমাজে সম্পদ থাকতে পারে, উন্নয়ন থাকতে পারে, কিন্তু যদি ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বস্তি না থাকে, তবে সেই সমৃদ্ধি মানুষের কাছে পূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে ওঠে না। আর এজন্য দেখছি দেশের শিক্ষিত সচেতন তরুণ শ্রেনী একটু সুযোগ পেলেই ইউরোপ-আমেরিকা ইত্যাদি দেশে পালাতে চায়। দেশের সব শিকড় ছিন্ন করে অবশেষে বিদেশকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়। লন্ডনে বসে প্রতিদিন দেখছি শত শত তরুণ-তরুনী গৃহকর্মী বা ডেলিভারিম্যান হিসাবে কঠোর পরিশ্রম করছে। কেউ কেউ ঘর ভাড়া না দিতে পেরে রাস্তা, পার্ক ইত্যাদি খোলা জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। ভূ-মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যাবার জন্য সাগরে ডুবে মরছে।
তাই মনে হচ্ছে, বিশ্ব পরিব্রাজক মরক্কোবাসী ইবনে বতুতার উক্তিটির যথার্থতা আজও তাই একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। তার বর্ণিত বাংলার মতোই আজকের বাংলাদেশও একদিকে সম্ভাবনা ও সম্পদের আলোয় উজ্জ্বল, অন্যদিকে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জনজীবনের চাপের কারণে এক জটিল বাস্তবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই প্রমাণ করে—সমৃদ্ধি একা কখনোই যথেষ্ট নয়, যদি না তার সঙ্গে ন্যায়, স্থিতি ও নিরাপত্তার ভারসাম্য নিশ্চিত হয়।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১৬ জুন ২০২৬