কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৩।। ব্রেক্সিটের দেয়াল, প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের স্বপ্ন এবং ব্রিটেনের ইউরোপ-দ্বিধা

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৩।।  ব্রেক্সিটের দেয়াল, প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের স্বপ্ন এবং ব্রিটেনের ইউরোপ-দ্বিধা

উৎসর্গ:

যারা বিভাজনের রাজনীতির বাইরে গিয়ে ঐক্য,

সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেন

—এই কলাম তাদের জন্য।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—যে দরজা একদিন জোরে বন্ধ করা হয়, সময়ের প্রয়োজনে সেই দরজার কাছেই আবার ফিরে আসতে হয়। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক যেন সেই ইতিহাসেরই এক জীবন্ত উদাহরণ।

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত ছিল আবেগ, জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিভক্ত এক সমাজের প্রতিফলন। কিন্তু প্রায় এক দশক পর বাস্তবতার আয়নায় দেখা যাচ্ছে—ইউরোপকে ছেড়ে আসা যতটা সহজ ছিল, ইউরোপের প্রভাব থেকে বেরিয়ে থাকা ততটা সহজ নয়।

নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে এখন সেই পুরোনো প্রশ্নই ফিরে এসেছে—ব্রিটেন কি ইউরোপ থেকে দূরে থাকবে, নাকি নতুন কোনো সম্পর্কের মাধ্যমে আবার কাছাকাছি আসবে?

ইউরোপীয় নেতারা বার্নহামকে স্বাগত জানিয়েছেন উষ্ণ বার্তায়। জার্মান চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে ইউরোপীয় কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্ব—সবাই বলেছেন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চান। কিন্তু কূটনীতির ভাষা যতই আশাবাদী হোক, বাস্তব রাজনীতির পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ।

বার্নহাম ইউরোপকে চেনেন, আবার ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের মনোভাবও বোঝেন। তিনি একসময় বলেছিলেন, জীবদ্দশায় ব্রিটেনকে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেখতে চান। এই বক্তব্য ইউরোপপন্থীদের কাছে আশার আলো। কিন্তু তিনি এটাও জানেন—ব্রেক্সিটের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। তাই ক্ষমতায় এসে তিনি ইউরোপে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন শুরু করবেন না; বরং ধীরে ধীরে সম্পর্ক মেরামতের পথে হাঁটবেন।

এটাই হয়তো তার রাজনৈতিক বাস্তবতা।

কারণ ব্রিটেনের রাজনীতিতে অভিবাসন প্রশ্ন এখনো সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক মানেই অনেক ক্ষেত্রে মুক্ত চলাচলের প্রশ্ন সামনে আসে। আর ব্রেক্সিট সমর্থকদের বড় অংশের কাছে এই বিষয়টিই ছিল উদ্বেগের কেন্দ্র।

কিন্তু পৃথিবীর অর্থনীতি আবেগ দিয়ে চলে না। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ সহজ না হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে।

এখানেই ব্রিটেনের বড় দ্বন্দ্ব—একদিকে জাতীয় নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের শুরু করা ইউকে-ইইউ সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ এখন বার্নহামের হাতে এসেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, ইউক্রেন ইস্যুতে সমন্বয় এবং বাণিজ্য সহজ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, কতদূর এগোতে পারবে এই সম্পর্ক?

ব্রাসেলস চায় ব্রিটেন আরও ঘনিষ্ঠ হোক, কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মের বাইরে থেকে সব সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ রাজনীতিকরা জানেন, ইউরোপের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা দেখালে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

এ যেন দুই নৌকায় পা রাখার চেষ্টা।

তবে বার্নহামের জন্য একটি সুযোগও রয়েছে। তিনি ব্রেক্সিটের পুরোনো যুদ্ধের বাইরে গিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন সম্পর্কের ভাষা তৈরি করতে পারেন। তরুণদের শিক্ষা, কাজ ও ভ্রমণের সুযোগ বাড়ানো, ব্যবসায়িক বাধা কমানো এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

রাজনীতিতে সব পরিবর্তন বিপ্লবের মাধ্যমে আসে না। অনেক পরিবর্তন আসে নীরব সমঝোতার মাধ্যমে।

হয়তো ব্রিটেন শিগগিরই ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরবে না। হয়তো ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্তও বাতিল হবে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি করা গেলেও অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে তাই শুধু ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং ব্রিটেনকে একটি নতুন বাস্তবতা বোঝানোর দায়িত্বও রয়েছে।

ব্রেক্সিটের যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু ব্রেক্সিটের প্রশ্ন এখনো জীবিত।

সময়ই বলবে, বার্নহাম কি সেই পুরোনো দ্বিধার রাজনীতি থেকে ব্রিটেনকে বের করে এনে সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারবেন, নাকি তিনিও আগের নেতাদের মতো একই দেয়ালে এসে আটকে যাবেন।

তবে সময় হয়তো এটাই বলে—পৃথিবীর দরজা বন্ধ করা যায়, কিন্তু বাতাসের চলাচল বন্ধ করা যায় না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরলে ব্রিটেনের সম্ভাব্য কি কি লাভ ?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি কোনো একদিন ব্রিটেন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এর সম্ভাব্য লাভ কী হতে পারে?

প্রথমত, ব্রিটেন আবার ইউরোপের বৃহৎ একক বাজারের পূর্ণ সুবিধা পেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অঞ্চল। বর্তমানে ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের যে কাগজপত্র, শুল্ক ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তা অনেকটাই কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, খাদ্য রপ্তানি, গাড়ি শিল্প, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাত উপকৃত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় শ্রমবাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্রিটেনের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। দক্ষ কর্মীর চলাচল সহজ হলে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, প্রযুক্তি, কৃষি ও বিভিন্ন শিল্পে জনবল সংকট মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

তৃতীয়ত, ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ইউরোপে বসবাস, কাজ, শিক্ষা ও ভ্রমণের সুযোগ আরও সহজ হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলতে পারে।

চতুর্থত, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও ব্রিটেন লাভবান হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগে ব্রিটেন আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।

পঞ্চমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গবেষণা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনমূলক প্রকল্পগুলোতে আরও ব্যাপক অংশগ্রহণ ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে। লন্ডনের আর্থিক খাতও ইউরোপীয় বাজারে আগের মতো সহজ প্রবেশাধিকার ফিরে পেলে নতুন সুযোগ পেতে পারে।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়া কোনো সহজ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে রয়েছে সার্বভৌমত্ব, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ব্রেক্সিট সমর্থকদের কাছে এসব বিষয় এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ভবিষ্যতে যদি ব্রিটেন আবার ইউরোপের দিকে ফিরে তাকায়, সেটি শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব হবে না; বরং এটি হবে ব্রিটেন তার পরিচয়কে কীভাবে দেখে—তার ওপর নির্ভরশীল একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের শক্তি শুধু একা চলার ক্ষমতায় নয়, প্রয়োজনের সময় কার সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে পারে—সেখানেও নিহিত।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, গল্পকার, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২৩ জুলাই ২০২৬