ফ্রান্স–ব্রিটেনের ‘একজন যাবে, একজন আসবে’ চুক্তির মেয়াদ বাড়ল

ফ্রান্স–ব্রিটেনের ‘একজন যাবে, একজন আসবে’ চুক্তির মেয়াদ বাড়ল

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৭ মে: 

ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় ব্রিটেনে প্রবেশ করা ‘অভিবাসন সংকট’ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই সংকট সামাল দিতে যে নীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে, সেটি হলো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ ‘one in, one out’ পরিকল্পনা। গত বছর আলোচনার ঝড় তুলে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron, সেটির পরীক্ষামূলক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ১১ জুন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—চ্যানেলের সংকট কমেনি, বরং রাজনৈতিক সমাধানের মেয়াদ আবার বাড়ানো হয়েছে অক্টোবর পর্যন্ত।

এই নীতির মূল কাঠামো খুব সরল

যে অভিবাসী ছোট নৌকায় ব্রিটেনে পৌঁছাবে, তাকে ফেরত পাঠানো হবে ফ্রান্সে। বিনিময়ে ফ্রান্সে অবস্থান করা আরেকজন আশ্রয়প্রার্থী, যিনি অবৈধভাবে চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করেননি, তাকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আনা হবে। শুনতে ভারসাম্যপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবে এটি মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা—সব দিক থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

নীতির উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—মানুষ পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং ছোট নৌকা পারাপার বন্ধ করা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। হাজার হাজার মানুষ এখনো ঝুঁকি নিয়ে চ্যানেল পার হচ্ছে। পাচারকারীরা তাদের ব্যবসায়িক কৌশল বদলেছে—কখনো বেলজিয়াম থেকে নতুন রুট, কখনো ট্রাকে করে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে অপরাধচক্রের এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে, যেখানে মানবজীবনই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে।

তবুও হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম মানুষ চ্যানেল পেরিয়েছে। তবে এই হ্রাসের পেছনে রাজনৈতিক সাফল্যের চেয়ে আবহাওয়ার ভূমিকা বেশি বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ঝড়ো বাতাস ও প্রতিকূল জলবায়ু অনেক দিন পারাপারকে অসম্ভব করে তুলেছে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০৫ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ৫৮১ জনকে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছে এই চুক্তির আওতায়। সংখ্যাগতভাবে এটি প্রায় সমান বিনিময় হলেও এর পেছনে থাকা মানবিক গল্পগুলো আরও জটিল।

অনেক আশ্রয়প্রার্থী এই নীতি নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। ফেরত পাঠানো এক ব্যক্তি বলেছেন, “এই সিদ্ধান্ত সত্যিই খুব কষ্টদায়ক। এটা কিছুই থামাবে না, কারণ মানুষ এখনো আসছে।” আরেকজন, যিনি ডিটেনশনে ছিলেন পরে মুক্তি পেয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় প্রক্রিয়ায় আছেন, জানিয়েছেন—ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেছে, তাদের অবস্থান জানা যায় না। তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতি আরও কঠোর হবে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

মানবাধিকার সংগঠন Joint Council for the Welfare of Immigrants এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি কার্যত রাষ্ট্র-সমর্থিত মানবপাচারের মতো। সংগঠনটির বক্তব্যে উঠে এসেছে এক কঠিন বাস্তবতা—এরা কেবল ‘অভিবাসী’ নয়, বরং এমন মানুষ যারা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার আশা নিয়ে সীমান্ত পেরোতে চায়।

অন্যদিকে UK Home Office এই নীতিকে সফল দাবি করছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬০ হাজারেরও বেশি ‘অবৈধ অভিবাসী’কে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং এটি তাদের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ। সরকারের যুক্তি হলো—এ ধরনের পদক্ষেপই মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করবে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—নীতি কি সত্যিই কাজ করছে, নাকি শুধু সংকটের মুখে একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে?

কারণ বাস্তবতা হলো, চ্যানেল পেরোনোর চেষ্টা থামেনি। পাচারকারীরা আরও সংগঠিত হয়েছে, আর আশ্রয়প্রার্থীরা আরও বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র একদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মানবিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—সীমান্ত রক্ষা কি মানবিক দায়িত্বের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে?

চুক্তির মেয়াদ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার মেয়াদ কতদিন বাড়বে, তার কোনো উত্তর এখনো কারও কাছে নেই।