ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ওপর সংঘবদ্ধ আক্রমণের চালচিত্র
ইতিহাস ও ঐতিহ্য ডেস্ক:
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশজুড়ে যে সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও অস্থিরতার আবহ তৈরি হয়, তার সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি এসে পড়ে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে। শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের বহু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকলা কেন্দ্র, পাঠাগার, ভাস্কর্য, জাদুঘর, ম্যুরাল ও ঐতিহাসিক স্মারক হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের শিকার হয়।
সংস্কৃতিকর্মী ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ, এসব হামলা ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনাকে দুর্বল করার একটি ধারাবাহিক প্রয়াস। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া হামলাগুলোর চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চেতনার প্রতীক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, “এসব হামলা শুধু ইট-পাথরের স্থাপনায় হয়নি; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই আঘাত করা হয়েছে।”
ধানমণ্ডির ছায়ানট: এক রাতেই তছনছ ছয়তলা সাংস্কৃতিক দুর্গ
রাজধানীর ধানমণ্ডির শঙ্কর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ছায়ানট ভবন দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকসংগীত, আবৃত্তি ও চারুকলার চর্চার মাধ্যমে দেশের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ধারাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত ১টার পর ভবনটিতে চালানো হয় ভয়াবহ হামলা।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক শ মুখোশধারী ব্যক্তি লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা ছয়তলা ভবনের প্রতিটি তলায় ঢুকে পদ্ধতিগতভাবে ভাঙচুর চালায়।
ছায়ানটে যেসব স্থাপনা ও সম্পদ ধ্বংস করা হয়:
- মিলনায়তনের চেয়ার, সাউন্ড সিস্টেম ও আলোকসজ্জা ভেঙে ফেলা হয়
- সংগীত প্রশিক্ষণ কক্ষের হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরা ধ্বংস করা হয়
- কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটরিং সিস্টেম ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়
- সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষ তছনছ করা হয়
- আলমারি, টেবিল, চেয়ার, জানালার কাচ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ভেঙে ফেলা হয়
- চারুকর্ম, মাটির শিল্পকর্ম ও দেয়ালসজ্জা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়
- বিভিন্ন সাংস্কৃতিক নথি ও কাগজপত্র ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়
- একাধিক বাদ্যযন্ত্র লুটপাট করা হয়
- ভবনের সামনের অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, “সকালে এসে মনে হয়েছে যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে আছি।”
প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ জানান, হামলায় প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তোপখানা রোডের উদীচী কার্যালয়: আগুনে পুড়ল ৫৭ বছরের ইতিহাস
ছায়ানটে হামলার মাত্র একদিন পর, ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর, রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উদীচী বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠন। দেশের প্রায় সব জেলায় এর শাখা রয়েছে।
সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটের দিকে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে একদল যুবক ভবনে প্রবেশ করে। পরে ভবনের দোতলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
উদীচীতে যেসব সম্পদ ধ্বংস হয়:
- কয়েক হাজার বই পুড়ে যায়
- ৫৭ বছরের সাংগঠনিক নথিপত্র ধ্বংস হয়
- আন্দোলন-সংগ্রামের দলিল ও রেজল্যুশন পুড়ে যায়
- পোস্টার, ব্যানার ও সাংস্কৃতিক আর্কাইভ নষ্ট হয়
- কম্পিউটার ও ডিজিটাল সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়
- নাটকের ১০টি পূর্ণাঙ্গ সেট আগুনে পুড়ে যায়
- অফিসকক্ষ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়
উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন জানান, হামলায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
২২ জেলায় শিল্পকলা একাডেমিতে হামলা
২০২৪ সালের আগস্টের সহিংসতার সময় দেশের অন্তত ২২টি জেলায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর বিভিন্ন শাখা আক্রান্ত হয়।
ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি হয় এখানে।
ধ্বংস করা হয়—
- ৪৫০ আসনের মিলনায়তন
- মঞ্চ ও কন্ট্রোলরুম
- মহড়াকক্ষ
- দর্শক গ্যালারি
- সাউন্ড ও লাইটিং সিস্টেম
- আসবাব ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম
হামলার পর ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি
- মিলনায়তন ও অফিসকক্ষে ভাঙচুর
- সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম নষ্ট
- নথিপত্র ছিঁড়ে ফেলা
সাতক্ষীরা শিল্পকলা একাডেমি
- প্রশিক্ষণকক্ষ ভাঙচুর
- বাদ্যযন্ত্র নষ্ট
- বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত
সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি
- মঞ্চসজ্জা ভেঙে ফেলা হয়
- প্রশাসনিক কক্ষ তছনছ করা হয়
ময়মনসিংহ, শেরপুর, নওগাঁ, টাঙ্গাইল, রংপুর, খুলনা, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায়
- শিল্পকলা একাডেমির অফিস, মিলনায়তন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হামলা
- চুরি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
- সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য
জাতীয় শিশু একাডেমি: শিশুদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও রক্ষা পায়নি
রাজধানীর দোয়েল চত্বরসংলগ্ন জাতীয় শিশু একাডেমি-তেও ভয়াবহ হামলা হয়।
যা যা ধ্বংস করা হয়:
- প্রশাসনিক ভবনে আগুন
- শিশু জাদুঘর ভাঙচুর
- পাঠাগার নষ্ট
- প্রশিক্ষণকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত
- প্রকাশনা বিভাগের নথিপত্র ধ্বংস
- শিশুদের ভাস্কর্য ও প্রদর্শনী উপকরণ ভাঙা হয়
- গাড়ি ও আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়
দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশু একাডেমির শাখাগুলোতেও হামলা হয়।
ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ধ্বংস: ইতিহাস মুছে ফেলার অভিযোগ
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী সময়ে দেশে দেড় হাজারের বেশি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়।
সুনামগঞ্জের ‘কৃষাণ চত্বর’
২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বম্ভরপুরে কৃষকের প্রতীকী ভাস্কর্য ‘কৃষাণ চত্বর’ হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
ত্রিশালের ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ভাস্কর্য
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটি ২০২৫ সালের জুনে প্রশাসনিক নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়।
বরগুনার নৌকা জাদুঘর
দেশের একমাত্র নৌকা জাদুঘরটি ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে ধ্বংস করা হয়।
এখানে—
- ১০০ ধরনের নৌকার প্রতিকৃতি ছিল
- ১৬৫ ফুট দীর্ঘ নৌকা আকৃতির স্থাপনা গুঁড়িয়ে ফেলা হয়
- লোকজ ঐতিহ্যের সংগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়
তদন্তে ধীরগতি, প্রশ্নে প্রশাসন
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনায় মামলা হলেও এখনো মূল পরিকল্পনাকারী বা অর্থদাতাদের শনাক্ত করা যায়নি।
ধানমণ্ডি থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, ভিডিও বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র এন এম নাসির উদ্দিন বলেন, হামলার নেপথ্যের অর্থায়নকারী ও সংগঠকদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
তবে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির অভিযোগ করেন, হামলার আগে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হলেও প্রশাসন তা প্রতিরোধ করেনি।
মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে বুদ্ধিজীবী ও সৃজনশীল মানুষদের টার্গেট করা হয়েছিল, একইভাবে এবার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আঘাত করা হয়েছে।”
সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষায়, ইউনূস আমলের এই ঘটনাগুলো শুধু কিছু ভবন বা ভাস্কর্যের ধ্বংস নয়; বরং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি, মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ওপর এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী আঘাত।