‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
বাংলাদেশ সচিবালয় যাচ্ছে আগারগাঁওয়ে, ব্যয় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৮ অক্টোবর:
রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তরের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগোল সরকার। ঢাকার আবদুল গণি রোডের বর্তমান অবস্থান থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। নতুন স্থাপনায় ২০২৯ সালের মধ্যে সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বিষয়টি জানান। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী প্রশাসনিক ও উন্নয়নসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
৩৪০৯ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাব
প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের কথা রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত ব্যয় ও সময়সীমাকে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ব্যয় এবং নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত সমাপ্তির তারিখ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রকল্পের বিস্তারিত অনুমোদন ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর এসব বিষয় নির্ভর করবে।
দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও ঢাকা ট্রিবিউন-এর প্রতিবেদনে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয়ে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে।
৩১ একরের বেশি জমিতে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগারগাঁওয়ে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে গড়ে উঠবে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স। এতে ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনগুলোতে থাকবে তিনটি করে বেজমেন্ট। মোট অফিস স্পেসের পরিমাণ প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট হতে পারে।
এ ছাড়া প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গাড়ি রাখার পার্কিং সুবিধার পরিকল্পনা রয়েছে। কমপ্লেক্সে মসজিদ, বহুমুখী মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘরের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধাও রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন ভবনগুলোতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দপ্তর এক জায়গায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। এতে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন সরানো হচ্ছে বর্তমান সচিবালয়
আবদুল গণি রোডে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয়ের জমির পরিমাণ প্রায় ১৭ দশমিক ৫৭ একর। সেখানে রয়েছে ১৩টি ভবন। প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত।
পুরোনো ভবনগুলোর কয়েকটি ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং একটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত। এসব ভবন নির্মাণের সময় আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল নকশার মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। ফলে পুরোনো অবকাঠামোর নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক প্রশাসনিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অফিসের জায়গা বাড়েনি। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান সচিবালয়ে অফিস স্পেস প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং কমপ্লেক্সের বাইরে থাকা দপ্তরগুলোকে জায়গা দিতে আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন।
অপর্যাপ্ত কর্মপরিসর, সীমিত পার্কিং এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতিও স্থানান্তরের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আগেও একাধিকবার নেওয়া হয়েছিল উদ্যোগ
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নতুন নয়। ১৯৭৪ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়ার পর ১৯৯০-এর দশকসহ বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা হয়েছে। ২০১৫ সালে আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের একটি প্রকল্পও সামনে আসে।
কিন্তু ওই সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন পায়নি। পরিকল্পনার যথার্থতা, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা এবং জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশ্বখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশায় গড়ে ওঠা সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকার পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন স্থাপনা সাংঘর্ষিক হবে কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে সামনে আসে।
২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়ও সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়েছিল। মূল নকশা যাচাই এবং পরিকল্পনার বিভিন্ন ঘাটতি দূর করার বিষয়টি তখন গুরুত্ব পায়।
পরবর্তী সময়েও স্থানান্তরের উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এবারের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে আগের জটিলতাগুলো কতটা কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়, তার ওপর।
সামনে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও শুধু এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা, অর্থায়ন, বিস্তারিত নকশা, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত বিষয় এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের ধাপগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
একই সঙ্গে নতুন সচিবালয়ের নির্মাণে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যানজটের ওপর প্রভাব এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের সুবিধাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সরকারের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয়ে কার্যক্রম শুরু করা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হলে প্রকল্প অনুমোদন থেকে নির্মাণ ও দপ্তর স্থানান্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে।