তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
শীতের আগেই চাপে ব্রিটেনের এনএইচএস, জরুরি সেবায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন | ১৮ অক্টোবর ।
শীত আসার আগেই বাড়তি চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএসে। গ্রীষ্মে রেকর্ডসংখ্যক রোগীর জরুরি বিভাগে উপস্থিতি, তীব্র গরমের প্রভাব এবং শীতকালীন ফ্লু ও নরোভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় আগেভাগেই প্রস্তুতি জোরদার করছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইংল্যান্ডের জরুরি চিকিৎসাসেবায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রোববার ব্রিটিশ সরকারের স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা বিভাগ জানায়, এই অর্থ দিয়ে ১৪টি জরুরি চিকিৎসা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় নতুন জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, একই দিনে জরুরি রোগী মূল্যায়ন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা, অ্যাম্বুলেন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের উন্নয়ন করা হবে। এ ছাড়া আগে ঘোষিত আরও ২৫টি নতুন বা সম্প্রসারিত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র শীতের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রীষ্মের চাপ কাটতে না কাটতেই শীতের উদ্বেগ
এনএইচএসের ওপর বাড়তি চাপের অন্যতম কারণ গ্রীষ্মে জরুরি বিভাগে রোগীর অস্বাভাবিক উপস্থিতি। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ হাসপাতালের দুর্ঘটনা ও জরুরি বিভাগে (এঅ্যান্ডই) চিকিৎসা নিতে গেছেন। গ্রীষ্মকালীন সময়ের হিসাবে এটি রেকর্ডসংখ্যক উপস্থিতি।
তীব্র গরমের কারণে অসুস্থতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতা মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়েছে। এখন শীতের সঙ্গে ফ্লু, নরোভাইরাস এবং কোভিড সংক্রমণ বাড়লে রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের আশঙ্কা, একই সময়ে জরুরি চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স এবং হাসপাতালের শয্যার চাহিদা বেড়ে গেলে রোগীদের দ্রুত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জরুরি বিভাগে অপেক্ষা কমানোই লক্ষ্য
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেছেন, ভারী কর্মব্যস্ততার একটি গ্রীষ্মের পর এবারের শীত এনএইচএসের জন্য আরও কঠিন হতে পারে। তাই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আগেভাগেই প্রস্তুতি এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন বিনিয়োগের একটি লক্ষ্য হলো সব রোগীকে একই ধরনের সেবার জন্য হাসপাতালের প্রধান জরুরি বিভাগের ওপর নির্ভর করতে না হওয়া। যেসব রোগী দ্রুত মূল্যায়ন ও চিকিৎসার মাধ্যমে একই দিনে বাড়ি ফিরতে পারবেন, তাঁদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য জরুরি বিভাগের সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি রোগীদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ে।
তবে নতুন অবকাঠামো ও অর্থ বরাদ্দের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী, শয্যা এবং অন্যান্য চিকিৎসাসুবিধা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।
রোগীদের জন্য কী অর্থ বহন করছে এই উদ্যোগ?
এনএইচএসের শীতকালীন প্রস্তুতির মূল পরীক্ষা হবে রোগীরা বাস্তবে কত দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন। জরুরি বিভাগে অপেক্ষার সময় কমছে কি না, অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো পৌঁছাচ্ছে কি না এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হলে শয্যা পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব সূচকেই উদ্যোগের কার্যকারিতা বোঝা যাবে।
স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমাতে যোগ্য ব্যক্তিদের ফ্লু ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক শীতকালীন টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ইংল্যান্ডে ৭৪ লাখের বেশি ফ্লুর টিকা দেওয়া হয়েছিল বলে সরকারি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি সাধারণ কিছু অসুস্থতার জন্য স্থানীয় ফার্মেসিতে চিকিৎসাসহায়তা নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো এবং সন্ধ্যা, সপ্তাহান্ত ও কর্মঘণ্টার বাইরেও জিপি সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা জোরদারের কথা জানিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে উপযুক্ত জায়গায় চিকিৎসা দেওয়া এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো।
অর্থ বরাদ্দই কি যথেষ্ট?
১৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন বিনিয়োগ জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এনএইচএসের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় শুধু নতুন অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
নার্সিং খাতের প্রতিনিধিরা অতিরিক্ত অর্থকে স্বাগত জানালেও কর্মীসংকট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিনের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, রোগীর চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
শীতের মৌসুমে অসুস্থতার প্রকোপ বাড়লে হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার সমন্বিত সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। ফলে সরকারের ঘোষিত বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হয়, তা বোঝা যাবে আগামী মাসগুলোতে রোগীদের অপেক্ষার সময়, জরুরি চিকিৎসার প্রাপ্যতা এবং হাসপাতালের ওপর চাপের পরিবর্তন থেকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কত টাকা বরাদ্দ হলো, তা নয়; বরং অসুস্থ হওয়ার পর একজন মানুষ কত দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন।