‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

অনলাইন প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে বিপদে ১৮০০ বাংলাদেশি

অনলাইন প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে বিপদে ১৮০০ বাংলাদেশি

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৮ অক্টোবর : ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে আটকে পড়া এবং দেশে ফেরার সামর্থ্য হারানো বাংলাদেশিদের সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া, অর্থসংকট ও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির দেশে ফেরা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা সামনে রেখে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও অভিবাসনকর্মীরা।

কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার সহায়তা চেয়ে ১ হাজার ৭৯৬ জন বাংলাদেশির বিষয়ে আবেদন ও যোগাযোগ এসেছে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের নিয়ে কাজ করা অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের হিসাবে, দেশটিতে এখনো ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটকে আছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

সংগঠনটির দাবি, নির্ধারিত সময়ের বেশি কম্বোডিয়ায় অবস্থান করলে অভিবাসন আইন অনুযায়ী জরিমানা দিতে হতে পারে। তবে এই সময়সীমা ও জরিমানার শর্ত কার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, জরিমানা মওকুফের সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্টতা প্রয়োজন।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মোহাম্মদ জামিল ওরফে সেন্টু এই দুর্দশারই একজন ভুক্তভোগী। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কম্বোডিয়ায় অবস্থান করলেও তাঁর এখন কোনো কাজ নেই, ভিসার মেয়াদও শেষ। দেশে ফেরার জন্য কয়েকবার টিকিট কিনেও প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। বর্তমানে অন্য বাংলাদেশিদের জন্য মাঝেমধ্যে রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের বিমানবন্দরে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করার সময় ৩২ বাংলাদেশিকে আটক করে দেশটির অভিবাসন পুলিশ। তাঁদের কয়েকজনকে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন মুক্তি পেলেও বাকি ৩০ জনকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালানো হয়। থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) জহির ইমাম আশা প্রকাশ করেন, তাঁদের কয়েক দিনের মধ্যে দেশে ফেরানো সম্ভব হবে। তবে টিকিটের খরচ তাঁদের নিজেদের বহন করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশের কম্বোডিয়ায় নিজস্ব দূতাবাস নেই। দেশটিতে বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হয় ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে। জহির ইমামের ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে সহায়তা চাওয়া প্রত্যেকের পরিচয়, বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দেশে ফেরার আবেদনকারীদের মানব পাচারের শিকার কি না, অথবা অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্র কিংবা পাচারচক্রের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা যাচাই করতে কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। যাঁদের মানব পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, তাঁদের দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে। কিন্তু যাচাইপ্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রয়েছে। এটি আবার চালুর জন্য মিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা আল আমিন নয়ন জানান, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফেরানো, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পৃথকভাবে শনাক্ত করা এবং জোরপূর্বক অপরাধে জড়িত হতে বাধ্য করা ব্যক্তিদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সংগঠনটি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অনুলিপি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দেওয়ার কথা রয়েছে। মানব পাচারচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের দাবিও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ঋণ করে বিদেশ, দেশে ফেরার টাকাও নেই

কম্বোডিয়ায় যাওয়ার আগে ভালো বেতনের চাকরির আশ্বাস পেয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের কারও কাজ নেই, কারও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, আবার কেউ কেউ নির্যাতন ও হুমকির মুখে পড়েছেন। দেশে ফেরার খরচ জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

বেসরকারি চাকরিজীবী কবির হোসেনের ছেলে শাওন প্রায় দেড় বছর আগে ২৪ বছর বয়সে কম্বোডিয়ায় যান। তাঁকে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিদেশযাত্রার জন্য পরিবারের প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ হয়, যার বড় অংশ ধার করা। এরপর ছেলের থাকা-খাওয়ার ব্যয় মেটাতে আরও টাকা পাঠাতে হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর পেছনে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন কবির। অথচ ছেলে দেশে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি।

ছেলেকে ফেরানোর জন্য দুবার অর্থ খরচ করেও সফল হননি কবির। এখন ঋণ পরিশোধ এবং আবার টিকিট কেনা—দুই চাপেই বিপর্যস্ত পরিবারটি।

ছাড়পত্রের পর নজরদারি কোথায়?

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় কাজের জন্য ১৫ হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক কর্মী যাওয়ার পর তাঁদের নিয়োগকর্তা, কর্মস্থল ও কাজের পরিবেশ সম্পর্কে কার্যকর নজরদারি কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসানের মতে, ছাড়পত্র দেওয়ার পর কর্মীরা কোথায় আছেন এবং কী ধরনের কাজ করছেন, তা জানার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তাঁর বক্তব্য, আটকে পড়া প্রত্যেকের পরিস্থিতি যাচাই করে নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

গত ৮ অক্টোবর কম্বোডিয়া থেকে তিন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়। তাঁদের একজন ঝিনাইদহের ২৩ বছর বয়সী সোহাগ আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর তিনি একটি প্রতারণাকেন্দ্রের চক্রে আটকে পড়েছিলেন।

কম্বোডিয়ার এই ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, মানব পাচার এবং কর্মীদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। শুধু দেশে ফেরার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; কীভাবে তাঁরা প্রতারণার শিকার হলেন, কারা তাঁদের বিদেশে পাঠিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোথায় ব্যর্থতা ছিল—সেসবও তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদ প্রত্যাবাসন, ঋণ ও পুনর্বাসন সহায়তা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।