ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশে নতুন মাদক কুশ: সেবনে থাকে না হুঁশ
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন | ১৮ অক্টোবর ।
বাংলাদেশের মাদকবাজারে নতুন উদ্বেগের নাম ‘কুশ’, যা সেবন করলে থাকে না হুশ। করতে পারে যে কোন দোষ।। থাইল্যান্ড থেকে আকাশপথে এই মাদক ‘কুশ’ দেশে আনার সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত চার মাসে প্রায় ৩৫ কেজি কুশ জব্দ এবং সাতজন বাহককে গ্রেপ্তার করা হলেও মাদকের সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারেনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নতুন এই মাদককে কেন্দ্র করে দেশে বড় বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।
সর্বশেষ গত ১৪ অক্টোবর ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শাড়ির আড়ালে আনা ৪ কেজি ২৮০ গ্রাম কুশসহ এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিজিৎ দাস নামের ওই ব্যক্তি থাইল্যান্ড থেকে মাদক নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন বলে ডিএনসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চালানটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দিয়ে তাঁর বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর আগে একইভাবে আরও ছয় ভারতীয় নাগরিককে কুশসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডকে যুক্ত করে একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক কাজ করছে। ভারতের নিম্নআয়ের কিছু মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে তাঁদের থাইল্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে বিমানে করে ঢাকায় আনা হয় মাদকের চালান। প্রতিটি চালানের বিনিময়ে বাহকেরা কয়েক হাজার রুপি পান বলে জানা গেছে। তাঁদের যাতায়াতের খরচও বহন করে চক্রের সদস্যরা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও মাদকের মালিক, অর্থদাতা ও বাংলাদেশে চালান গ্রহণকারীদের শনাক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ভেতরে কয়েকজন সন্দেহভাজন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ওপর নজরদারি চলছে। বাহকদের ভ্রমণবৃত্তান্ত, ফোনের তথ্য ও অর্থ লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকার অভিজাত এলাকায় কুশের চাহিদা বাড়ছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। দাম বেশি হওয়ায় আপাতত উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এর বাজার গড়ে উঠছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই মাদক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কর্মকর্তারা। গত আগস্টে শাহজালাল বিমানবন্দরে কুশের পাঁচটি চালান আটক করা হয়েছিল।
কুশের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডজাতীয় কিছু মাদক সেবনে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, খিঁচুনি, তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি ও মনোবিকারের মতো গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে ‘কুশ’ নামে বিক্রি হওয়া সব পণ্যের উপাদান এক নয়। তাই উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করে এর ঝুঁকি নির্ধারণ করা জরুরি।
বাংলাদেশে কুশের উপস্থিতি নিয়ে এর আগেও তদন্ত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীর একটি বাসায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কুশ চাষের জন্য তৈরি পরীক্ষাগারের সন্ধান পায় ডিএনসি। সেখান থেকে বীজ, গাছ ও সদ্য সংগ্রহ করা কুশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তৌসিফ হাসান (২২) ও তাঁর বান্ধবীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এখন চোরাচালানের উৎস, থাইল্যান্ডে সরবরাহকারী, বাংলাদেশে চালান গ্রহণকারী এবং অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্ত করাই তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য। এ ঘটনায় ভারতীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারতকে জানানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু বাহক গ্রেপ্তার করে থেমে থাকলে এই চক্রের বিস্তার ঠেকানো কঠিন। আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, দেশীয় ক্রেতা-বিক্রেতা ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, বিমানবন্দরে নজরদারি জোরদার এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো—এই তিন দিকেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।