ব্রিটেন সংবাদ
ব্রিটেনে পাত্র-পাত্রীর সন্ধান: বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য ১০টি বাস্তব পথ
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৯ সেপ্টেম্বর :
ব্রিটেনে বাংলাদেশি পরিবারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বিয়ের বিষয়টিও অনেক পরিবারের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে থাকলে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনের মাধ্যমে পাত্র-পাত্রীর সন্ধান পাওয়া যেত। ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বা বড় হওয়া ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো ব্যবস্থা অনেক সময় কাজ করছে না।
কেউ চান ব্রিটিশ-বাংলাদেশি পরিবার, কেউ চান বাংলাদেশের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক বজায় থাকুক। কেউ আবার ধর্মীয় মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেন, কেউ শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ও ব্যক্তিত্বকে। ফলে এখন শুধু ‘একজন ছেলে’ বা ‘একজন মেয়ে’ খোঁজা নয়—বরং দুই পরিবারের প্রত্যাশা ও দুই তরুণ-তরুণীর জীবনদর্শনের মধ্যে মিল খোঁজাই বড় বিষয়।
লন্ডনে অবশ্য পাত্র-পাত্রীর সন্ধানের বেশ কয়েকটি বাস্তব পথ রয়েছে।
১. আল-ইহসান ম্যারেজ সার্ভিস—হোয়াইটচ্যাপেল
পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো Al-Ihsan Marriage Service। এটি লন্ডন মুসলিম সেন্টার, ৪৬ হোয়াইটচ্যাপেল রোডে অবস্থিত।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে তারা মুসলিমদের জন্য ম্যারেজ সার্ভিস দিয়ে আসছে। নিবন্ধিত সদস্যরা প্রোফাইল দেখতে পারেন এবং পছন্দ হলে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। অপর পক্ষ আগ্রহ গ্রহণ করলে পরবর্তী পর্যায়ে যোগাযোগের তথ্য দেওয়া হয়। নারী সদস্যের ক্ষেত্রে অভিভাবক বা ‘ওয়ালি’কে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ঠিকানা: লন্ডন মুসলিম সেন্টার, ৪৬ হোয়াইটচ্যাপেল রোড, লন্ডন E1 1JQ
ফোন: ০২০ ৭৬৫০ ৩০২৬
২. রাইবার—ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম
নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য Raibar একটি আলাদা ধরনের উদ্যোগ। নিজেদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি বিশেষভাবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মুসলিমদের জন্য তৈরি এবং পরিবারকে শুরু থেকেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
এখানে বাংলাদেশের জেলা, বাংলা ভাষার ধরন—যেমন সিলেটি, ঢাকাইয়া বা চাটগাঁইয়া—এবং যুক্তরাজ্যের শহর অনুযায়ী প্রোফাইল খোঁজার সুবিধার কথা বলা হয়েছে। মা-বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যও প্রোফাইল পরিচালনা করতে পারেন।
প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে বিনামূল্যে যোগদানের কথা বলছে এবং প্রোফাইল যাচাইয়ের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছে। তবে ‘ভেরিফায়েড’ লেখা থাকলেও পরিবারকে নিজেদের মতো করে পরিচয়, চাকরি ও বৈবাহিক তথ্য যাচাই করা উচিত।
৩. সুন্নাহ নিকাহ—পূর্ব লন্ডনের আরেকটি বিকল্প
Sunnah Nikah UK পূর্ব লন্ডনের ৫৩৬ হাই স্ট্রিট নর্থ, লন্ডন E12 6QN ঠিকানায় তালিকাভুক্ত একটি মুসলিম ম্যারেজ সার্ভিস।
তাদের অনলাইন উপস্থিতিতেও মুসলিমদের জন্য ম্যাট্রিমোনিয়াল সেবা ও পরিচয় তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি পরিবার চাইলে যোগাযোগ করে বর্তমান সদস্যপদ, প্রোফাইল ও ম্যাচমেকিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন।
তবে কোনো অর্থ দেওয়ার আগে বর্তমান ফি, পরিষেবার ধরন এবং প্রোফাইল যাচাই কীভাবে করা হয়—তা সরাসরি জেনে নেওয়া উচিত।
৪. ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টার
অনেক পরিবার সরাসরি মসজিদের ইমাম, আলেম বা কমিউনিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে পাত্র-পাত্রীর খবর দেন।
London Muslim Centre এবং ইস্ট লন্ডন মসজিদে বিয়ে ও নিকাহ-সংক্রান্ত সেবা রয়েছে। ইস্ট লন্ডন মসজিদের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তারা ইসলামী বিবাহের চুক্তি সম্পাদনের সুবিধা দেয় এবং নিকাহ সনদও প্রদান করে।
তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—নিকাহ সম্পাদনের সেবা আর পাত্র-পাত্রীর সন্ধান একই বিষয় নয়। সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খোঁজার জন্য সংশ্লিষ্ট সেবা আছে কি না, আগে জেনে নিতে হবে।
৫. পরিবারের পরিচিত নেটওয়ার্ক
এখনও সবচেয়ে কার্যকর একটি পথ হলো নিজেদের পরিচিত নেটওয়ার্ক।
টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, রেডব্রিজ, ইলফোর্ড, বার্কিং, ড্যাগেনহ্যাম ও হ্যাকনির বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে বহু বছরের সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে। মসজিদ, কমিউনিটি সংগঠন, ব্যবসায়ী মহল, স্কুল-কলেজের অভিভাবক এবং পারিবারিক বন্ধুদের মাধ্যমে অনেক সম্ভাব্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে একটি ছোট ম্যারেজ প্রোফাইল তৈরি করা যেতে পারে।
যেমন—
- বয়স
- উচ্চতা
- শিক্ষা
- পেশা
- বসবাসের এলাকা
- নাগরিকত্ব বা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসের প্রয়োজনীয় তথ্য
- পারিবারিক পরিচিতি
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশা
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তবে পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক তথ্য, জাতীয় বীমা নম্বর বা পূর্ণ বাসার ঠিকানার মতো সংবেদনশীল তথ্য কাউকে দেওয়া উচিত নয়।
৬. কমিউনিটি অনুষ্ঠান ও পরিচিত মহল
বিয়ে খোঁজার জন্য সরাসরি ‘ম্যারেজ ইভেন্ট’ ছাড়াও বিভিন্ন কমিউনিটি অনুষ্ঠান কাজে লাগতে পারে।
ঈদ পুনর্মিলনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক সভা, সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠান বা স্থানীয় মসজিদকেন্দ্রিক পারিবারিক কার্যক্রমে বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হয়।
তবে কাউকে অনুষ্ঠানে দেখে পছন্দ হওয়া আর তার সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য জানা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে পরিবারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা উচিত।
৭. অনলাইন মুসলিম ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্ম
যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন অনলাইন ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।
এসব প্ল্যাটফর্মের সুবিধা হলো—একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে লন্ডনের বাইরে বার্মিংহাম, লুটন, ম্যানচেস্টার, কার্ডিফসহ অন্যান্য শহরের পরিবারগুলোর সঙ্গেও পরিচয় তৈরি করা যায়।
তবে অনলাইন প্রোফাইলকে কখনোই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ছবি, বয়স, পেশা, শিক্ষা, বৈবাহিক অবস্থা কিংবা ব্রিটেনে থাকার অধিকার—প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা সূত্রে যাচাই করা উচিত।
৮. মেয়ের বা ছেলের নিজের সামাজিক নেটওয়ার্ক
ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বা বড় হওয়া তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের পাশাপাশি তাদের নিজেদের সামাজিক নেটওয়ার্কও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, পেশাগত সংগঠন, বন্ধুদের পরিবার এবং কমিউনিটি কার্যক্রম থেকে সম্ভাব্য পরিচয় তৈরি হতে পারে।
এখানে বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সন্তানের মতামতকে বাদ দিয়ে শুধু পরিবারের পছন্দে সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
প্রথমে পরিচয়, তারপর আলোচনা, তারপর দুই পরিবারের সাক্ষাৎ—এভাবে এগোনো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
৯. বিয়ের আগে যে ৮টি বিষয় অবশ্যই যাচাই করবেন
পাত্র বা পাত্রী পছন্দ হওয়ার পর পরিবারের আবেগের চেয়ে তথ্য যাচাইকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
এক. পরিচয়: নাম, বয়স ও পরিচয়পত্র।
দুই. বৈবাহিক অবস্থা: আগে বিয়ে হয়েছিল কি না, বিচ্ছেদ হয়েছে কি না, সন্তান আছে কি না।
তিন. শিক্ষা: যে ডিগ্রি বা যোগ্যতার কথা বলা হচ্ছে তা সত্য কি না।
চার. পেশা: কোথায় কাজ করেন এবং যে পেশার কথা বলা হয়েছে তা বাস্তব কি না।
পাঁচ. ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস: বিশেষ করে বিদেশ থেকে কাউকে বিয়ে করে যুক্তরাজ্যে আনার ক্ষেত্রে।
ছয়. ঋণ ও আর্থিক দায়িত্ব: প্রয়োজন হলে বিয়ের আগে অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা।
সাত. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কোথায় বসবাস করবেন, সন্তান, চাকরি এবং পরিবারের দায়িত্ব।
আট. ব্যক্তিগত সম্মতি: ছেলে বা মেয়ে নিজের ইচ্ছায় বিয়েতে রাজি কি না।
১০. শুধু ব্রিটিশ পাসপোর্টকে যোগ্যতার মাপকাঠি বানাবেন না
কিছু পরিবার বিদেশে থাকা পাত্র বা পাত্রী খোঁজার সময় প্রথমেই নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের অধিকারকে গুরুত্ব দেয়।
আইনি অবস্থান জানা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একজন মানুষের নাগরিকত্ব তার চরিত্র, দায়িত্ববোধ বা দাম্পত্য জীবনের উপযোগিতার প্রমাণ নয়।
একইভাবে বাংলাদেশে থাকা কোনো পাত্র বা পাত্রীকে শুধু বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনার কারণে বিয়ে করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যে বিয়ের পর বসবাসের ক্ষেত্রে আলাদা অভিবাসন বিধি রয়েছে। তাই বিদেশ থেকে কাউকে আনার পরিকল্পনা থাকলে সরকারি নিয়ম আগে যাচাই করা উচিত।
একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়
ইসলামী নিকাহ এবং যুক্তরাজ্যের দেওয়ানি বিবাহ নিবন্ধন এক জিনিস নয়।
আল-ইহসানের নিকাহ সেবা-সংক্রান্ত তথ্যেও স্পষ্ট বলা হয়েছে যে নিকাহ সনদ দেওয়ার পাশাপাশি আইনগত ও দেওয়ানি স্বীকৃতির জন্য বিবাহকে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থায় নিবন্ধন করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ শুধু নিকাহ সম্পন্ন করলেই যুক্তরাজ্যের আইনে বিবাহের সব অধিকার নিশ্চিত হয়েছে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রতারণা থেকে বাঁচতে তিনটি নিয়ম
প্রথম নিয়ম—টাকা পাঠাবেন না।
অনলাইনে পরিচয়ের পর কেউ হঠাৎ চিকিৎসা, ব্যবসা, ভিসা, ঋণ বা অন্য কোনো অজুহাতে টাকা চাইলে সতর্ক হতে হবে।
দ্বিতীয় নিয়ম—একাধিক সূত্রে তথ্য যাচাই করুন।
শুধু ফেসবুক প্রোফাইল বা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটের তথ্য যথেষ্ট নয়।
তৃতীয় নিয়ম—দুই পরিবারকে যুক্ত করুন।
সম্পর্কটি সিরিয়াস পর্যায়ে গেলে দুই পরিবারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা উচিত।
তাহলে কোন পথে শুরু করবেন?
ব্রিটেনের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হতে পারে—
প্রথম ধাপ: ছেলে বা মেয়ের নিজের চাহিদা ও সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার করা।
দ্বিতীয় ধাপ: একটি সংক্ষিপ্ত ম্যারেজ প্রোফাইল তৈরি করা।
তৃতীয় ধাপ: আত্মীয়স্বজন ও বিশ্বস্ত কমিউনিটিতে তা জানানো।
চতুর্থ ধাপ: আল-ইহসান বা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি-কেন্দ্রিক রাইবারের মতো সেবা বিবেচনা করা।
পঞ্চম ধাপ: সম্ভাব্য পাত্র বা পাত্রী বাছাইয়ের পর পরিবারকে যুক্ত করা।
ষষ্ঠ ধাপ: পরিচয়, শিক্ষা, পেশা ও বৈবাহিক ইতিহাস যাচাই করা।
সপ্তম ধাপ: ছেলে ও মেয়েকে নিজেদের মধ্যে কথা বলার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া।
অষ্টম ধাপ: বিয়ের আগে আইনি ও ইমিগ্রেশন বিষয়গুলো পরিষ্কার করা।
মূল কথা হচ্ছে, পাত্র-পাত্রীর সন্ধান এখন আর শুধু আত্মীয়ের খাতায় কয়েকটি নাম লেখার বিষয় নয়। লন্ডনের বাংলাদেশি পরিবারগুলোর হাতে এখন মসজিদ, কমিউনিটি নেটওয়ার্ক, পেশাগত যোগাযোগ, পরিবারকেন্দ্রিক ম্যারেজ সার্ভিস এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে একাধিক পথ রয়েছে।
কিন্তু পথ যতই আধুনিক হোক, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় একই—তথ্য যাচাই, দুই পরিবারের বোঝাপড়া এবং ছেলে-মেয়ের স্বাধীন সম্মতি।