ব্রিটেন সংবাদ
যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের পরিকল্পনা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৩ আগস্ট:
যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার। এর অংশ হিসেবে বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল কেনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারের এই উদ্যোগকে ঘিরে এরই মধ্যে জ্বালানি খাতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির জন্য নতুন অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ ব্যয় না করে উত্তর সাগরের নিজস্ব তেল-গ্যাস সম্পদ কাজে লাগানোই বেশি কার্যকর হতে পারে।
বিশেষ করে রোজব্যাংক ও জ্যাকড’ (Rosebank and Jackdaw) প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের দাবি উঠেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ওপর ব্রিটেনের নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ গ্যাস ঘাটতির সতর্কতার কারণে। সরকারি পর্যায়ে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে ২০৩০-এর দশকে দীর্ঘস্থায়ী শীত বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের সময় ব্রিটেনের গ্যাস সরবরাহ বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে উত্তর সাগরে নতুন করে তেল-গ্যাস উত্তোলনের বিরোধিতাও প্রবল। পরিবেশবাদীদের যুক্তি, রোজব্যাংক ও জ্যাকড’ প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বা ভোক্তাদের বিল কমানোর ক্ষেত্রে সীমিত ভূমিকা রাখবে, অথচ এগুলো যুক্তরাজ্যের জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
রোজব্যাংক একটি বড় প্রস্তাবিত তেলক্ষেত্র, আর জ্যাকড’ মূলত গ্যাস প্রকল্প। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্যাকড’ চালু হলে সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময়ে এটি ব্রিটেনের উত্তর সাগরের গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত দিতে পারে এবং দেশটির গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে।
বার্নহ্যামের সামনে তাই একদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চাপ, অন্যদিকে জলবায়ু নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কঠিন পরীক্ষা তৈরি হয়েছে। লেবার সরকারের ২০২৪ সালের নির্বাচনী অঙ্গীকারে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও রোজব্যাংক ও জ্যাকড’ ইতোমধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রকল্প। আদালতের রায়ের পর সেগুলোর উন্নয়ন অনুমোদন নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এদিকে বিরোধী কনজারভেটিভরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলছে, উত্তর সাগরের প্রকল্পগুলো ঝুলিয়ে রেখে বিদেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো যুক্তিযুক্ত নয়। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প নয়; বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও জ্বালানি দক্ষতায় বড় বিনিয়োগ।
ফলে বার্নহ্যামের সম্ভাব্য গ্যাস নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতি, জলবায়ু অঙ্গীকার এবং উত্তর সাগরের তেল-গ্যাস শিল্পের ভাগ্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রোজব্যাংক ও জ্যাকড’ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর নীতির প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠছে।