ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

আশুরার ফজিলত: প্রচলিত কিছু কর্মকাণ্ড, যা কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেই

আশুরার ফজিলত: প্রচলিত কিছু কর্মকাণ্ড, যা কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেই

ধর্ম ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল: মুহাররম মাস ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। এই মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা। ইসলামে আশুরার দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সহিহ হাদিসে এ দিনের রোজার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যুগে যুগে আশুরাকে ঘিরে এমন অনেক রীতি-নীতি ও কর্মকাণ্ড চালু হয়েছে, যার কোনো ভিত্তি কোরআন বা সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না।

একজন মুসলমানের জন্য ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, তাই পালন করা। আর যা প্রমাণিত নয়, তা ধর্মের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

আশুরা সম্পর্কে সহিহ হাদিসে যা আছে

আশুরার দিনে রোজা রাখার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“আমি আশা করি, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২

রাসুল (সা.) আরও নির্দেশ দেন যে ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা করার জন্য ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা উত্তম।

আশুরাকে ঘিরে প্রচলিত কিছু ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড

১. বিশেষ খাবার রান্না করলে সারা বছর বরকত হবে

অনেক এলাকায় বিশ্বাস করা হয়, আশুরার দিনে বিশেষ খিচুড়ি, হালুয়া বা নির্দিষ্ট খাবার রান্না করলে সারা বছর ঘরে বরকত থাকবে।

কিন্তু কোরআন বা কোনো সহিহ হাদিসে এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো প্রমাণ নেই। কোনো নির্দিষ্ট খাবার রান্নাকে ইবাদত বা বরকতের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করা ইসলামে অনুমোদিত নয়।

২. আশুরার দিনে গোসল করলে এক বছরের রোগ দূর হবে

কিছু সমাজে প্রচলিত আছে যে আশুরার দিন বিশেষ গোসল করলে রোগ-ব্যাধি দূর হয়।

হাদিস বিশারদগণ এ বিষয়ে বর্ণিত সব হাদিসকে দুর্বল বা জাল বলে উল্লেখ করেছেন।

আল-মাওদু‘আত এবং আল-মানারুল মুনিফ-এ এ ধরনের বর্ণনার অসারতা আলোচনা করা হয়েছে।

৩. আশুরার রাতে বিশেষ নামাজ

কিছু বই-পুস্তকে আশুরার রাতে ১০০ রাকাত, ৪ রাকাত বা নির্দিষ্ট পদ্ধতির বিশেষ নামাজের কথা উল্লেখ করা হয়।

হাদিস বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বর্ণনার কোনোটি সহিহ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এ ধরনের নামাজের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ উল্লেখ করেছেন যে আশুরাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবিত বহু আমলের কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।

৪. আশুরার দিনে চোখে সুরমা দিলে বিশেষ সওয়াব

কিছু অঞ্চলে বিশ্বাস করা হয়, আশুরার দিনে সুরমা ব্যবহার করলে চোখের রোগ হবে না।

হাদিস গবেষকগণ এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে জাল বা ভিত্তিহীন বলেছেন। সহিহ হাদিসে এমন কোনো নির্দেশনা নেই।

৫. আশুরার দিনে নতুন কাপড় পরা বা উৎসব করা

কিছু স্থানে আশুরাকে ঈদের মতো আনন্দ-উৎসবের দিনে পরিণত করা হয়।

অন্যদিকে কিছু স্থানে অতিরিক্ত শোকানুষ্ঠান পালন করা হয়।

আহলে সুন্নাহর অবস্থান হলো—আশুরাকে না উৎসবের দিন বানানো হবে, না শোকের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা হবে। বরং সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রাখা ও আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করাই প্রকৃত আমল।

৬. আশুরার দিনে নির্দিষ্ট দোয়া পড়লে সব চাওয়া পূরণ হবে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই কিছু বিশেষ দোয়া প্রচার করা হয়, যেগুলোকে আশুরার নির্দিষ্ট দোয়া বলে দাবি করা হয়।

এসব দাবির অধিকাংশের কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিসভিত্তিক উৎস নেই। মুসলমান যেকোনো সময় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া পড়তে পারেন, কিন্তু আশুরার জন্য বিশেষ দোয়া নির্ধারণ করার প্রমাণ নেই।

৭. তাজিয়া, মিছিল ও আত্মপ্রহার

কিছু অঞ্চলে আশুরাকে কেন্দ্র করে তাজিয়া মিছিল, শরীরে আঘাত করা, বুক চাপড়ানো বা রক্তাক্ত হওয়ার মতো কর্মকাণ্ড দেখা যায়।

ইসলামে নিজেকে আঘাত করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৯৪; সহিহ মুসলিম

কারবালার ঘটনা ও আমাদের করণীয়

আশুরার দিনে সংঘটিত কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়। ইমাম হুসাইন ইবনে আলী-এর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর কষ্টের বিষয়। তবে তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা, আত্মপ্রহার বা ভিত্তিহীন অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করা নয়।

আশুরার দিনটি ফজিলতময়। কিন্তু ফজিলত অর্জনের পথও হতে হবে কোরআন ও সহিহ সুন্নাহনির্ভর। কোনো আমল জনপ্রিয় হলেই তা ইসলামের অংশ হয়ে যায় না। একজন সচেতন মুসলমানের উচিত ধর্মীয় বিষয়ে আবেগ নয়, প্রমাণকে প্রাধান্য দেওয়া।

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর আনুগত্য, সুন্নাহর অনুসরণ এবং দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন থেকে সতর্ক থাকা। তাই এ বছর আশুরা এলে আমরা যাচাই করি—আমাদের আমল কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, নাকি সমাজের প্রচলিত প্রথার অনুসরণ মাত্র?