বাংলাদেশ সংবাদ
হিমালয়ের ঢল: বাংলাদেশের জন্য কতটা বড় সতর্কবার্তা?
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৭ আগস্ট:
হিমালয়ে হঠাৎ পাহাড়ধস, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা কিংবা অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট আকস্মিক ঢল এখন আর শুধু পাহাড়ি জনপদের দুর্যোগ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে হাজার কিলোমিটার দূরের নিম্নপ্রবাহের দেশগুলোর নদী ও জনজীবনেও। বাংলাদেশের জন্য তাই নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক ভয়াবহ ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নেপাল ও তিব্বতে বহু মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মূল্যায়নে জানা যায়, এর পেছনে ছিল হিমবাহধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে—হিমালয়ের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না।
উষ্ণ হচ্ছে হিমালয়, বাড়ছে ঝুঁকি
হিমালয়কে বলা হয় এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’। এ অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহ থেকে উৎপন্ন পানি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোকে সমৃদ্ধ করে।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই হিমালয়ই এখন ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে। হিমবাহ দ্রুত গলছে, নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে এবং অনেক পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। অতিবৃষ্টির সঙ্গে এসব ঝুঁকি যুক্ত হলে হঠাৎ পাহাড়ধস কিংবা ভয়াবহ ঢলের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
একটি পাহাড়ধস কোনো নদীর গতিপথ আটকে দিতে পারে। সেখানে সাময়িক জলাধার তৈরি হতে পারে। পরে সেটি ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে নেমে আসতে পারে বিপুল পানির স্রোত ও পাথর-মাটির ধ্বংসাবশেষ।
ফলে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় কয়েক ধাপে বড় দুর্যোগে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশ কি সরাসরি ঝুঁকিতে?
বাংলাদেশে নেপালের মতো হিমবাহ নেই। তাই নেপালের কোনো পাহাড়ধস বা হিমবাহধসের ভয়াবহ স্রোত সরাসরি অক্ষত অবস্থায় বাংলাদেশের বদ্বীপে পৌঁছে যাবে—এমন আশঙ্কা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে বাংলাদেশকে ঝুঁকিমুক্ত ভাবারও সুযোগ নেই।
কারণ বাংলাদেশ রয়েছে বিশাল গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী অববাহিকার নিম্নপ্রবাহে। হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি, পলি ও বিভিন্ন ধরনের নদীপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত এই বদ্বীপের নদীগুলোতেই এসে মেশে।
উজানে বড় ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি একই রকম শক্তিতে বাংলাদেশে পৌঁছাবে না ঠিকই, কিন্তু নদীর পানি প্রবাহ, পলি পরিবহন ও বন্যার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন বাংলাদেশের নদীগুলো এমনিতেই বিপুল পানির চাপ বহন করে, তখন উজানের অতিরিক্ত প্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আসল প্রয়োজন আগাম তথ্য
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্ক নয়, আগাম প্রস্তুতি।
হিমালয়ের কোনো দুর্গম উপত্যকায় বিপর্যয় ঘটার পর সেটি বাংলাদেশে পৌঁছানো পর্যন্ত কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, নদীগুলোর পানি কতটা বাড়ছে এবং কোন এলাকায় কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এসব দ্রুত বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এ জন্য শুধু দেশের ভেতরের নদী পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সীমান্ত পেরিয়ে উজানের তথ্য সংগ্রহ, উন্নত আবহাওয়া ও নদী পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময়।
হিমালয়ের কোনো ঘটনা বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটি বুঝতে হলে পুরো নদী অববাহিকাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।
পাহাড়ের বিপদ শেষ পর্যন্ত বদ্বীপেরও বিপদ
হিমালয়ের বরফ কমে গেলে একদিকে বাড়তে পারে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের সঞ্চিত বরফ কমে গেলে হিমবাহনির্ভর নদীগুলোর পানি প্রবাহ নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ সামনে শুধু বন্যার ভয় নয়; পানি নিরাপত্তা, কৃষি, জলবিদ্যুৎ, জীববৈচিত্র্য, নদী ব্যবস্থাপনা ও মানুষের বসবাস—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ তাই হিমালয় থেকে অনেক দূরে হলেও হিমালয়ের পরিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ পাহাড় আর বদ্বীপকে যুক্ত করে রেখেছে পানি।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই পুরনো সত্যটিকেই নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। হিমালয়ে কোনো দুর্যোগ ঘটলে সেটিকে শুধু নেপাল, ভারত বা তিব্বতের স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়ে আসছে। এটি পুরো নদী অববাহিকার সমস্যা।
আর সেই অববাহিকার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।
তাই বিপর্যয় বাংলাদেশের সীমানায় পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে, উজানে কী ঘটছে তা আগে জানতে পারাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।