বাংলাদেশ সংবাদ

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশায় শহর অচল, চাপে কৃষিও

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশায় শহর অচল, চাপে কৃষিও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৭ আগস্ট:

বাংলাদেশের শহরগুলোতে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের অন্যতম সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। নিম্নআয়ের মানুষের চলাচল এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই যান এখন নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। একই সঙ্গে অননুমোদিত চার্জিং, বিদ্যুৎ অপচয় এবং গ্রাম থেকে কর্মক্ষম মানুষের শহরমুখী হওয়ার কারণে কৃষিশ্রমিক সংকট নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার অননুমোদিত চার্জিং ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এসব যান চার্জ দিতে দৈনিক আনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নগরের সড়কে এর প্রভাবও স্পষ্ট। প্রধান সড়কে বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও জরুরি সেবার যানবাহনের সঙ্গে একই জায়গায় ধীরগতির রিকশা চলাচল করায় যানপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য হঠাৎ থেমে যাওয়া, অনিয়মিতভাবে মোড় নেওয়া কিংবা বিপরীতমুখী চলাচলের মতো ঘটনা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও গণপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ যানগুলোকে ব্যস্ত সড়কে দ্রুত চলতে হয়। সেখানে বিপুলসংখ্যক ধীরগতির যান থাকলে সড়কের কার্যকর ধারণক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে যানজটের কারণে যাতায়াতে সময় ও জ্বালানি—দুটিরই অপচয় বাড়ে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় গ্রামীণ শ্রমবাজার। তুলনামূলক কম শারীরিক পরিশ্রমে নগদ আয় করার সুযোগ থাকায় অনেক মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে শহরে রিকশা চালাতে আসছেন। এর ফলে গ্রামে কৃষিশ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ধান কাটা ও ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে শ্রমিক সংকট দেখা দিলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো ফসল সংগ্রহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

চার্জিং ব্যবস্থাপনাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় অননুমোদিত বা অনিরাপদ স্থানে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। পুরোনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার না করা হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে শুধু সমস্যার উৎস হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। শহরের অলিগলি, আবাসিক এলাকা এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে এসব যান সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এর ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক চালকের জীবিকা রয়েছে।

তাই হঠাৎ করে সব ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করার পরিবর্তে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা। প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডরে এগুলোর চলাচল সীমিত করা যেতে পারে। স্থানীয় ও আবাসিক সড়কে নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে চলাচলের সুযোগ রাখা যেতে পারে।

এর পাশাপাশি চালকদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সের আওতায় আনা, যানবাহনের কারিগরি পরীক্ষা এবং নিরাপদ ও অনুমোদিত চার্জিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার জন্যও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর পরিবহন ব্যবস্থায় মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ ও গতিশীল গণপরিবহন নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে রিকশাচালকদের জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ধাপে ধাপে প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট রুট চালু এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে একই সঙ্গে নগরের যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ব্যাটারিচালিত রিকশা তাই নিষিদ্ধ না নিয়ন্ত্রিত—এই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে জননিরাপত্তা, নগরের গতিশীলতা এবং মানুষের জীবিকার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা যায়। নগর পরিকল্পনায় এখন সেই সমাধানই সবচেয়ে জরুরি।