‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৬ ।। হিমালয়ের কোল থেকে
।। হিমালয়ের কোল থেকে।।
উৎসর্গ
হিমালয়ের কোল থেকে ফিরে আসতে না-পারা সেই সব মানুষদের স্মরণে,
আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও যাঁরা জীবনের সন্ধানে ছুটে চলেছেন—
সকল উদ্ধারকর্মী ও স্বজনহারা মানুষের প্রতি।

আমি বেঁচে আছি, বন্ধু : সাইমন
মোবাইলের ওপাশে সাইমনের কণ্ঠ কাঁপছে। মাঝে মাঝে শব্দ থেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কথা বলার চেয়ে শ্বাস নেওয়াটাই যেন তার কাছে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
লন্ডনের আইল অব ডগসের ক্যানারি ওয়ারফের বাসিন্দা সাইমন। বহুদিনের বন্ধু সাহিত্যিক-সাংবাদিক রহমান সাহেব। নেপাল ভ্রমণে গিয়ে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলের মধ্যে পড়ে সাইমন এবার ফোন করেছেন রহমানকে।
—রহমান, তুমি ফোনটা ধরেছ?
—হ্যাঁ সাইমন। তুমি কোথায়? তোমার কোনো খবর পাচ্ছিলাম না।
—আমি বেঁচে আছি, বন্ধু।
কথাটা বলেই সাইমন চুপ করে যান।
—বেঁচে আছ—এই কথাটাই এখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় খবর। তুমি নিরাপদে আছ তো?
—নিরাপদ? জানি না। শরীরে বড় কোনো আঘাত নেই। কিন্তু এখানে নিরাপদ বলে কিছু আছে কি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।
রহমান উৎকণ্ঠিত হয়ে বলেন—
—কী হয়েছে? আমাকে সব বলো।
সাইমন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
—প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। মাটি কাঁপছিল। মানুষ দৌড়াচ্ছিল। তারপর একটা শব্দ হলো... এমন শব্দ আমি জীবনে শুনিনি।
—তারপর?
—তারপর পাহাড়ের দিক থেকে একটা দেয়াল আসতে দেখলাম।
—পানির দেয়াল?
—শুধু পানি নয়, রহমান। কাদা, বরফ, পাথর আর পানি—সব একসঙ্গে। মনে হচ্ছিল হিমালয়ের একটা অংশ ভেঙে আমাদের দিকে ছুটে আসছে।
রহমান নিঃশব্দে শুনছেন।
—কত দ্রুত এসেছিল?
—এত দ্রুত যে মানুষ দৌড়ানোর সুযোগও পায়নি। চোখের সামনে সবকিছু বদলে গেল। মনে হলো এক মিনিটের মধ্যে একটা জনপদ ইতিহাস হয়ে গেল।
—তুমি তখন কোথায় ছিলে?
—সীমান্তের কাছাকাছি। আমরা একটা হোটেলের আশপাশে ছিলাম। হঠাৎ সবাই চিৎকার করে ছুটতে শুরু করল। আমিও দৌড়ালাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না। শুধু জানি, পেছনে তাকালে মৃত্যু আসছে।
—তোমার সঙ্গে যারা ছিল?
—অনেকেই আলাদা হয়ে গেছে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। গাড়িগুলো ভেসে গেছে। বড় বড় ট্রাকও স্রোতের সামনে কিছুই ছিল না।
সাইমনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
—রহমান, তুমি জানো, মানুষকে চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখলে কেমন লাগে?
রহমান চুপ।
—আমি দেখেছি। একজন মানুষ সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছিল। কয়েক সেকেন্ড পর তাকে আর দেখা যায়নি। আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি।
—নিজেকে দোষ দিও না, সাইমন। ওই পরিস্থিতিতে কেউ কাউকে বাঁচাতে পারত না।
—জানি। কিন্তু মন তো সেটা মানে না।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা।

তারপর রহমান বলেন—
—সাইমন, তুমি আর এক মুহূর্তও সেখানে থেকো না। যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ জায়গায় যাও। তারপর লন্ডনে ফিরে এসো।
—আমি ফিরতে চাই, বন্ধু। সত্যিই ফিরতে চাই।
—তাহলে সেটাই করো। এখন কোনো অ্যাডভেঞ্চার নয়। জীবন আগে।
—রহমান, আজ বুঝলাম জীবন কত ভঙ্গুর। সকালে মানুষ ঘর থেকে বের হয়। দুপুরের আগেই তার ঘর, রাস্তা, গাড়ি—কিছুই থাকে না।
—তুমি শক্ত থাকো।
—শক্ত থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু একটা ভয় বারবার ফিরে আসছে।
—কী ভয়?
—আবার যদি আসে?
রহমান ধীরে বলেন—
—তুমি এখন নিরাপদ জায়গায় যাও। উদ্ধারকারীদের সঙ্গে থাকো। আর আমাকে নিয়মিত ফোন করবে।
—যদি ফোনের নেটওয়ার্ক না থাকে?
—সুযোগ পেলেই একটা বার্তা দেবে। শুধু লিখবে—‘আমি বেঁচে আছি।’
সাইমন এবার একটু হাসেন।
—ঠিক আছে।
তারপর হঠাৎ গলার স্বর বদলে যায়।

—রহমান, একটা অনুরোধ আছে।
—বলো।
—আমার জন্য দোয়া করো।
রহমানের গলা ভারী হয়ে আসে।
—আমি তোমার জন্য দোয়া করছি। আমাকে আবার এজন্য অনুরোধ করতে হয়বে নাকি বন্ধু? সবাইকে বলব তোমার জন্য দোয়া করতে।
—আমার পরিবারকেও বলো আমি বেঁচে আছি। ওদের ফোন করে পাচ্ছি না। মনে হয় আমার স্ত্রী স্টেফনি ফোন রেখে দূরে আছে বাচ্চাদের নিয়ে।
—হতে পারে। স্টিফনি বলছিলো সে নাকি বাচ্চাদের নিয়ে ‘ক্লাকটন অন সি’ সাগর সৈকতে যাচ্ছে। আমি একটু পরে তোমার ঘরে গিয়ে ওদের খোঁজ নিচ্ছি। তুমি চিন্তা করোনা। নিজেরকে রক্ষা করো। আর আমাকে একটা কথা প্রতিশ্রুতি দাও।
—কী?
—আমি যদি নিরাপদে লন্ডনে ফিরি, তুমি আমাকে ক্যানারি ওয়ারফে নিয়ে যাবে। থেমসের পাশে বসে অনেকক্ষণ কথা বলব। কোনো পাহাড় থাকবে না, কোনো নদীর গর্জন থাকবে না। শুধু লন্ডনের পরিচিত বাতাস।
রহমান মৃদু হেসে বলেন—
—আমি তোমাকে নিজেই নিয়ে যাব। তবে তার আগে তুমি তাড়াতাড়ি লন্ডনে ফিরে এসো।
—ফিরব, বন্ধু। আমি ফিরতে চাই। কিন্তু সব রাস্তাঘাট আপাতত বন্ধ। প্লেন উড়ছে না। আমি ফেরার চেষ্টায় আছি। শুনছি দ্বিতীয় আরেকটা ঢেউ আসতে পারে। ভয়ে আছি আমরা সবাই। দোয়া করো।
—সাইমন, সাবধানে থেকো।
—তুমিও। আর আমার জন্য দোয়া করো।
ফোনটি কেটে যায়।
রহমান অনেকক্ষণ মোবাইলটির দিকে তাকিয়ে থাকেন।
ক্যানারি ওয়ারফের আকাশে তখন হয়তো সন্ধ্যা নামছে। থেমসের পানি শান্ত। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে হিমালয়ের কোল থেকে নেমে আসা পানি, বরফ, কাদা আর পাথর মানুষের জীবনে রেখে গেছে এক দুঃস্বপ্নের গল্প।
সাইমন বেঁচে আছেন।
কিন্তু তার কণ্ঠে বারবার ফিরে আসে সেই এক মিনিটের স্মৃতি—
‘রহমান, মনে হচ্ছিল হিমালয়টা আমাদের দিকে ছুটে আসছে।’
আর লন্ডনের এক বন্ধু তখন শুধু একটি কথাই বলছেন—
‘ফিরে এসো সাইমন। যত তাড়াতাড়ি পারো, ফিরে এসো। আল্লাহ তোমাদের রক্ষা করুন’।
লন্ডন,, ২৭ আগস্ট ২০২৬