বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, ঝুঁকিতে জননিরাপত্তা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৭ আগস্ট:
দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব দলে সদস্য সংখ্যা ৪ হাজার ৩৬২ জনের বেশি।
পুলিশের হিসাবে, ঢাকা মহানগরের বাইরে বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে রয়েছে ২২৭টি গ্রুপ। এসব দলে সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, রাজশাহীতে ১৩টি, গাজীপুরে ১৩টি এবং খুলনায় সাতটি গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি গ্রুপের সন্ধান মিলেছে নোয়াখালীতে—২৫টি।
রাজধানীতেও পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। ডিএমপির তথ্য বলছে, ঢাকায় ১৫৯টি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮১২ জন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে সবচেয়ে বেশি ২৭টি গ্রুপ রয়েছে। পল্লবী এলাকায় রয়েছে ১৬টি গ্রুপ।
এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, হামলা, দখল এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় এক যুবককে একটি গ্যাংয়ের সদস্য পরিচয় দিয়ে নির্জন গলিতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে তিনি পুলিশের কাছে আশ্রয় নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকায় এ ধরনের ছিনতাই ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
খিলগাঁও, সবুজবাগ, ডেমরা, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের তালিকার বাইরেও একাধিক গ্রুপের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও এসব দলের সদস্যদের বড় অংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে হলেও কিছু এলাকায় তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্করাও এসব গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও ভূমিকা রাখছে। অভিভাবকদের নজরদারির অভাব, মাদক, অসৎ সঙ্গ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বেকারত্ব, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং নিজেকে ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর অন্যতম কারণ।
পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কিশোরদের অপরাধে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা দিয়ে কিশোর অপরাধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িত কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও সামাজিক মূল্যবোধের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।