তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কী পেল বাংলাদেশ?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৭ সেপ্টেম্বর :
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষে আজ সকালে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল ৮টা ২১ মিনিটে তাঁকে বহনকারী এমিরেটসের ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সফরের চার কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, আটটি জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি এবং ১১টি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক।
সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ফলাফলগুলোর একটি হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি। বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই চুক্তি হয়েছে। তবে নতুন ১১টি উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট মডেল, দাম, অর্থায়ন পদ্ধতি ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ১৪টি বোয়িং কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছিল। নতুন ১১টি যুক্ত হলে বোয়িং থেকে বিমানের পরিকল্পিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫টি।
১১ দেশের সঙ্গে বৈঠক
সফরে তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, ক্রোয়েশিয়া, হাইতি, ভুটান ও থাইল্যান্ডের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।
কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। এসব আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাত ও বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয় গুরুত্ব পায়। তিন দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অর্থনৈতিক আলোচনা
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা জোরদারের বিষয় আলোচনা হয়।
নিউইয়র্কে জেপিমরগানের আয়োজনে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন চাওয়া
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে দেওয়া প্রায় ১৭ মিনিটের ভাষণটি তিনি বাংলায় দেন। তাঁর আগে বাংলাদেশের পক্ষে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তারেক রহমানের এই ভাষণ ছিল তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ এবং তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা।
স্বাস্থ্য ও জলবায়ু
গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আলোচনায় জনস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান, সাশ্রয়ী টিকা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয় উঠে আসে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার অতিরিক্ত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে; এর মধ্যে ৮০ হাজার নারী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী থাকার কথা।
জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির সুযোগ এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফরে কিছু বিষয়ে সরাসরি চুক্তি হয়েছে, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়েছে আলোচনা, সহযোগিতার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের প্রতিশ্রুতি। ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিটি সফরের অন্যতম দৃশ্যমান বাণিজ্যিক ফলাফল হলেও, এর আর্থিক মূল্য ও সরবরাহের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তাই সফরের অর্জন মূল্যায়নে ঘোষিত চুক্তির সঙ্গে আলোচনাধীন বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।