কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৫ ।। তেলাবিবের তেলতেলে তেলসমাতিতে তেল দেবে না তেহরান

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৫ ।। তেলাবিবের তেলতেলে তেলসমাতিতে তেল দেবে না তেহরান

উৎসর্গ

“বিশ্ব রাজনীতির খেলায় প্রতিদিন মূল্য দেওয়া সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে”

হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব তেলের শ্বাসনালী

মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি—এই শব্দযুগল উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অদ্ভুত দৃশ্য: বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার, কূটনীতির সূক্ষ্ম দাবা খেলা, আর পৃথিবীর অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা এক সরু নৌপথ। সেই পথের নাম হরমুজ প্রণালী। আর সেই প্রণালী ঘিরেই এখন নতুন করে শক্তির হিসাব কষছে তেহরান।

সম্প্রতি ইরান স্পষ্ট ঘোষণা করেছে—তেলাবিবসহ যুদ্ধবাজ কোনো দেশকে তারা হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে তেল পরিবহনের সুযোগ দেবে না। এই ঘোষণাটি নিছক হুঁশিয়ারি নয়; এটি একটি সুস্পষ্ট বার্তা—তেল এখন আর শুধু পণ্য নয়, এটি ক্ষমতার ভাষা, প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সময়ের চাপে পড়েছেন—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হোয়াইট হাউস বলছে, স্থলবাহিনী ছাড়াই কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা বারবার সেই আশাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ট্রাম্পের দাবি—ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী সমঝোতার জন্য মরিয়া। কিন্তু তেহরান সেই দাবি সরাসরি নাকচ করেছে। বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—অনেকে ওয়াশিংটনের চেয়ে তেহরানের বক্তব্যকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন। এটি শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি আস্থার সংকট।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত এই সরু নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল ও বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। কিন্তু এখন সেই পথ কার্যত অচল হওয়ার মুখে।

“চোকপয়েন্ট”—যুদ্ধবিদ্যার এই শব্দটির বাস্তব রূপ যেন হরমুজ। এমন এক সংকীর্ণ পথ, যেখানে সামান্য চাপেই পুরো প্রবাহ থেমে যেতে পারে। আজ সেই তাত্ত্বিক আশঙ্কা বাস্তব হয়ে উঠছে। দুই পাশে সামরিক উত্তেজনা, আকাশে যুদ্ধবিমান, সাগরে টহলজাহাজ—আর মাঝখানে অনিশ্চয়তার মধ্যে ধীরে চলা তেলবাহী জাহাজ।

এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তেলের দাম বাড়ছে, মজুদ কমছে। দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি মৌসুম হুমকির মুখে, খাদ্য সংকট এমনকি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব হয়তো সেই পর্যায়ে যাবে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো—
জ্বালানির দাম বাড়ছে, খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, রান্নাঘরেও জ্বলছে।

এই বাস্তবতায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি সরাসরি যুদ্ধে জড়াননি। বিশ্লেষকদের মতে, এই “দূরে থাকা” নীতি তার জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।

কারণ ব্রিটিশ জনগণ এখন আর কোনো বিদেশি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। দীর্ঘদিনের সামরিক ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাজ্যের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একসময় সমুদ্র শাসনকারী রয়্যাল নেভি আজ একটি পূর্ণ সক্ষম যুদ্ধজাহাজ পাঠাতেও হিমশিম খাচ্ছে—এমন সমালোচনাও শোনা যাচ্ছে।

ফলে স্টারমারের কৌশল—যুদ্ধের বাইরে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—অনেকের কাছেই বাস্তববাদী মনে হচ্ছে।

কিন্তু এই পুরো কৌশলগত খেলায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে সাধারণ মানুষ।
পেট্রোলের দাম বাড়ছে, খাদ্যের মূল্য বাড়ছে, মানুষ খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে, আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।

এই অবস্থায় যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রাচেল রিভস-এর ওপর চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি ব্যয় এবং জ্বালানি সংকটে জনগণকে সহায়তা—দুটিই প্রয়োজন, কিন্তু সরকারি অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ, যুদ্ধটি শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক নয়—এটি অর্থনীতির ভেতরেও গভীর ক্ষত তৈরি করছে।

এখন প্রশ্ন হলো—এই পুরো পরিস্থিতিতে কে এগিয়ে?

ইরান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—ইসরাইলমুখী তেল প্রবাহ বন্ধ করা—তা শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, বরং কৌশলগত অবস্থান। আন্তর্জাতিক বাজারে তারা তেল রপ্তানি চালিয়ে যাবে, কিন্তু নির্দিষ্ট গন্তব্যে নয়। অর্থাৎ, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাব বিস্তার।

এই পদক্ষেপের ফলে একদিকে বাজারে অস্থিরতা বাড়বে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। ইসরাইলের জ্বালানি নির্ভরতা বাড়বে, আর তেহরান ধীরে ধীরে নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

এই জায়গায় এসে পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ প্রবন্ধের সেই কথাটি মনে পড়ে যায়—
“এক তেলে মনও ঘোরে, আরেক তেলে চাকাও ঘোরে।”

আজ সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। তেলের জন্যই যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধেই মানুষের মন বিষিয়ে উঠছে। ট্রাম্প তেলাবিবের নেতানিয়াহুর কথায় এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাচ্ছেন।

ইউরোপের অনেক দেশই আর ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। ট্রাম্প শত শত গ্যালন তেল দিয়েও আজ ইউরোপীয় নেতাদের মন গলাতে পারছেন না।

অন্যদিকে, তেলের ঘাটতিতে বিশ্বজুড়ে গাড়ির চাকাও যেন ধীর হয়ে গেছে—আমেরিকা, ইসরাইল—কেউই এর বাইরে নয়।

ফলে বাস্তবতা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে—
যদি তেলাবিব ও আমেরিকা তাদের এই একগুঁয়ে যুদ্ধনীতি চালিয়ে যায়, তাহলে লাভবান হবে তেহরানই।

তেলের রাজনীতির এই খেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পিছিয়ে পড়বে, আর ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন শক্তিধর “বাঘ” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে আমেরিকা-ইসরাইল জোট থেকে।

অতএব, শিরোনামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আজকের বিশ্বের পুরো বাস্তবতা—
তেলাবিবের তেলতেলে তেলসমাতিতে তেহরান আর তেল দেবে না; বরং তেলকে হাতিয়ার বানিয়ে পুরো খেলার দিকটাই ঘুরিয়ে দেবে তেহরান।


লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৯ মার্চ, ২০২৬