কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৪ ।। অসুখ-বিসুখ: মানুষের জীবনে পরীক্ষা, নেয়ামত ও আত্মজাগরণের আহ্বান

প্রাণী বলতে আমরা মূলত একটি চলমান, সজীব ব্যবস্থাকেই বুঝি—এক ধরনের জৈব মেশিন। সেই অর্থে মানুষও ব্যতিক্রম নয়; বরং অত্যন্ত জটিল একটি “জীবন্ত মেশিন”। আর যেকোনো মেশিনের মতোই এই দেহযন্ত্রের কলকব্জা মাঝেমধ্যে ঢিলা হবেই—এটাই স্বাভাবিক। আমরা সেই অবস্থাকেই বলি অসুখ বা অসুস্থতা। জীবনের পুরো সময়জুড়ে ছোট-বড় নানা শারীরিক সমস্যার ভেতর দিয়ে না গিয়ে কেউই থাকে না—কারো কম, কারো বেশি।
তবুও আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের চারপাশে এমন মানুষ পাওয়া যায়, যারা খানিকটা গর্বের সুরেই বলেন—“আমার কোনো অসুখ-বিসুখ হয় না, জীবনে একটা প্যারাসিটামলও খেতে হয়নি।” প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি এটি ভালো স্বাস্থ্যের নিদর্শন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বাস্তবতা লুকিয়ে আছে?
আজকের এই কলামে আমরা সেই বিষয়টিই একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করব—চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ধর্মীয় আলোকে। কারণ দেশ-রাজনীতি কিংবা বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে লিখতে একঘেয়েমি যেমন আসে, তেমনি পাঠকরাও হয়তো মাঝে মাঝে ভিন্ন স্বাদের কিছু প্রত্যাশা করেন। তাই আজকের এই প্রয়াস—অসুখ-বিসুখকে নতুনভাবে বোঝার একটি ছোট চেষ্টা।
প্রথমে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি বোঝা জরুরি।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মানুষের শরীর একটি জটিল ও গতিশীল ব্যবস্থা, যা প্রতিনিয়ত নানা জীবাণু—ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা যখন বলি “অসুস্থ নই”, তখন আসলে বোঝানো হয়—শরীর দৃশ্যমান উপসর্গ প্রকাশ করছে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শরীরের ভেতরে কোনো প্রক্রিয়া চলছে না। চল্লিশ বা পঞ্চাশের পর শরীর যদি ছোটখাটো সমস্যা না হয় তাহলে কিন্তু লক্ষণ ভাল নয়। বরং শরীর চেকআপ করা দরকার। কারণ হয়তো দেখা যাবে শরীরে কোন অজানা রোগও লুকিয়ে বাসা বেঁধে বসে আছে। কারণ সব সময় লক্ষণ দেখেও সব রোগ বোঝা যায় না। এভাবে বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদও বসে ছিলেন। হঠাৎ যখন সিঙ্গাপুরে গিয়ে চেক করালেন তখন দেখা গেল ক্যানসারের চতুর্থ স্টেইজ চলছে। তারপর তো সবই ইতিহাস। এভাবে প্রচুর উদাহরণ দেয়া যাবে।
চিকিৎসকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো:
উপসর্গ না থাকলেই রোগ নেই—এটি সবসময় সত্য নয়।
অনেক রোগ দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে অবস্থান করে, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, এমনকি কিছু ক্যান্সারও প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ দেখায় না। ফলে “আমি কখনো অসুস্থ হই না”—এই ধারণা অনেক সময় অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়।
এছাড়া আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝে মাঝে হালকা অসুস্থতা—যেমন সর্দি, জ্বর বা ক্লান্তি—শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (immune system) সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। এটি শরীরের জন্য একধরনের স্বাভাবিক অনুশীলন, যা ভবিষ্যতে বড় রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসুখকে অনেক সময় “warning signal” বা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। যখন শরীর অসুস্থ হয়, তখন তা আমাদের জানায়—
আমাদের জীবনযাত্রায় হয়তো ভারসাম্যহীনতা এসেছে;
খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ বা শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে কোনো সমস্যা রয়েছে।
এসব দৃষ্টিকোণ থেকে অসুখ-বিসুখ সবসময় নেতিবাচক নয়; বরং এটি একটি প্রয়োজনীয় সংকেত, যা আমাদের সচেতন হতে বাধ্য করে।
এখন ধর্মীয় আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে…”
— (সূরা আল-বাকারা ২:১৫৫)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষের জীবনে কষ্ট ও অসুস্থতা আল্লাহর নির্ধারিত পরীক্ষার অংশ। এটি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও বলা হয়েছে:
“যখন আমি অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”
— (সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৮০)
এখানে রোগ ও আরোগ্যের মধ্যে একটি ঈমানি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। রোগ আসতে পারে, কিন্তু আরোগ্য আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই—এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে দৃঢ় ও আশাবাদী রাখে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে অসুখের একটি গভীর তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে:
“কোনো মুসলিম যদি কোনো কষ্ট, রোগ, দুঃখ বা উদ্বেগে আক্রান্ত হয়—এমনকি একটি কাঁটার আঘাতেও—আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ মাফ করে দেন।”
— (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ, অসুস্থতা একজন মুমিনের জন্য কেবল কষ্ট নয়; বরং এটি পাপমোচন ও আত্মশুদ্ধির একটি মাধ্যম।
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা নির্ধারণ করেননি।”
— (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি)
এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম কেবল ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেয় না; বরং চিকিৎসা গ্রহণ ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেও উৎসাহিত করে।
সবশেষে, দুটি দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্র করলে একটি স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র সামনে আসে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে—অসুখ শরীরের একটি সংকেত, যা আমাদের সতর্ক করে এবং সুস্থ জীবনযাপনের দিকে ফিরিয়ে আনে।
ধর্ম বলে—অসুখ আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুযোগ।
উভয় ক্ষেত্রেই অসুখ একটি জাগরণ—একটি থেমে যাওয়ার মুহূর্ত, যেখানে মানুষ নিজের ভেতর ও বাইরের বাস্তবতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করে।
অতএব, “আমি কখনো অসুস্থ হই না”—এই গর্বিত উচ্চারণের পরিবর্তে একজন সচেতন মানুষের বলা উচিত:
“আমি সুস্থ আছি—এটি আল্লাহর নেয়ামত, আর অসুস্থতা এলে তা আমার জন্য শিক্ষা।”
এই ভারসাম্যপূর্ণ উপলব্ধিই একজন আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, সচেতন ও বিশ্বাসী মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৮ মার্চ, ২০২৬