বিশ্ব সংবাদ

এল নিনোর ‘গডজিলা’ রূপ: বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অস্থিরতা, বাংলাদেশের জন্যও সতর্ক সংকেত

এল নিনোর ‘গডজিলা’ রূপ: বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অস্থিরতা, বাংলাদেশের জন্যও সতর্ক সংকেত

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ আগস্ট:

প্রশান্ত মহাসাগরের পানি উষ্ণ হচ্ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে পৃথিবীর আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা। স্বাভাবিক একটি জলবায়ু চক্র এল নিনো এবার এমন শক্তিশালী রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে পৃথিবীর বহু প্রান্তে। বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে কারণ মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে যে এল নিনো তৈরি হচ্ছে, সেটিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘গডজিলা’ এল নিনো বলা হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ দিকে এটি সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু আবহাওয়ার ওপর নয়—কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, মানুষের স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ এবং অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে।

নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোর শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর তীব্রতা পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে, উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। এই উষ্ণ পরিবেশে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু ব্যবস্থার প্রভাব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এল নিনো আসলে কী?

এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে উঠলে বায়ুমণ্ডলের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দিতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।

সমুদ্রের তাপমাত্রার এই পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দেয়। ফলে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে দেখা দিতে পারে প্রচণ্ড খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও বন্যা ও ঝড়ের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

এ কারণেই বিজ্ঞানীদের কাছে এল নিনো শুধু সমুদ্রের একটি উষ্ণতার ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

এবার কেন এত উদ্বেগ?

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের জায়গাটি হলো এল নিনোর সম্ভাব্য তীব্রতা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে একটি শক্তিশালী এল নিনো যখন এই উষ্ণ পৃথিবীর ওপর আঘাত হানে, তখন তাপমাত্রা আরও ওপরে উঠে যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। শুষ্ক অঞ্চলে পানির সংকট বাড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে ফসল ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থাৎ একই জলবায়ু ঘটনা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।

৫ কোটি মানুষের খাদ্যঝুঁকি

এল নিনোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি খাদ্যনিরাপত্তা।

শক্তিশালী খরা বা অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। উৎপাদন কমলে দাম বাড়ে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ।

নতুন গবেষণার আশঙ্কা অনুযায়ী, বর্তমান শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধা বা খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে।

খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে সংকট শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, ভুট্টা, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দামও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে কী ঝুঁকি?

বাংলাদেশ সরাসরি এল নিনোর কেন্দ্রস্থলে নয়। কিন্তু বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশটি মুক্তও নয়।

বাংলাদেশের কৃষি মূলত বৃষ্টিপাত, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই বৃষ্টির সময়, পরিমাণ ও বণ্টনে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে কৃষি ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

একদিকে অতিবৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আমনসহ বিভিন্ন ফসল। অন্যদিকে দীর্ঘ শুষ্কতা দেখা দিলে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।

ফলে এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশের জন্য সরাসরি ‘বন্যা’ বা ‘খরা’—এমন একটি নির্দিষ্ট সমীকরণ নয়। বরং সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়া।

খাদ্যের বাজারেও চাপ আসতে পারে

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

বিশ্বের বড় খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলো যদি এল নিনোর কারণে উৎপাদন ঘাটতির মুখে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

তখন আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যয় বাড়বে। ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দাম—সবকিছু মিলিয়ে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

ফলে এল নিনো বাংলাদেশের কৃষকের মাঠে না এলেও তার প্রভাব বাজারের পণ্যের দামে এসে পৌঁছাতে পারে।

তাপপ্রবাহ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে এল নিনোর যোগ হলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অতিরিক্ত গরমে বয়স্ক মানুষ, শিশু, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়তে পারে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে দীর্ঘ তাপপ্রবাহের সঙ্গে বায়ুদূষণ ও নগর তাপদ্বীপের প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

বন্যা ও খরার মাঝখানে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা, অন্য অঞ্চলে কম বৃষ্টির কারণে খরা—এমন পরিস্থিতি কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তাই শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা শুধু খরা মোকাবিলা নয়, পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার জন্য সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

এখন কী করা দরকার?

এল নিনোর প্রভাব ঠেকানো সম্ভব নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে এর ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—

প্রথমত, আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভেদে খরা ও অতিবৃষ্টিসহিষ্ণু ফসলের জাতের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, খাদ্য মজুত ও বাজার পরিস্থিতি আগেভাগে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের বাজারে তার ধাক্কা কমানো যায়।

চতুর্থত, শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।

পঞ্চমত, পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি।

আসল বার্তা কোথায়?

এল নিনো নতুন কোনো বিপদ নয়। মানবসভ্যতা বহুবার এর প্রভাব দেখেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতির পার্থক্য হলো—আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করছি, যে পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ।

তাই প্রকৃতির স্বাভাবিক একটি ঘটনা যখন উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন তার প্রভাবও নতুন মাত্রা পেতে পারে।

বর্তমান ‘গডজিলা’ এল নিনো তাই কেবল একটি আবহাওয়ার খবর নয়। এটি একই সঙ্গে খাদ্য, পানি, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এমন প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনাগুলো কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে—তার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা নেই।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তনকে আর ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার প্রভাব এখন প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনাগুলোর মধ্যেও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।