বাংলাদেশ সংবাদ
গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই: তীব্র সংকটে জনজীবন ও উৎপাদন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৮ আগস্ট:
দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং রাজধানীর বাইরে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ হিসাবে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় ২৩৮ থেকে ২৪০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক গ্যাস ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ কোটি ঘনফুট।
এই ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং সন্ধ্যায় তা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কথা জানা গেলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেক এলাকায় কয়েক ঘণ্টা থেকে ৮-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সংকট শুধু আলো-ফ্যানেই সীমাবদ্ধ নেই। আবাসিক গ্রাহকদের অনেকেই চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকায় রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন জীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।
অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। অনেক চালককে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করতে দেখা গেছে। এতে কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশই জ্বালানি সংগ্রহে ব্যয় হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর ডায়িং ও নিটিং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই ধরনের জ্বালানি সংকট একসঙ্গে দীর্ঘায়িত হলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আরও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত জোরদার করা না গেলে দেশের জ্বালানি সংকট কতটা দীর্ঘ হবে—আর তার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাতকে কতটা দিতে হবে।