‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫১ ।। যুদ্ধে যাচ্ছি, মাকে দেখিস

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫১ ।। যুদ্ধে যাচ্ছি, মাকে দেখিস

।। যুদ্ধে যাচ্ছি, মাকে দেখিস ।।

উৎসর্গ

সেই সব মায়ের প্রতি,
যাঁদের সন্তানেরা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বিদেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু আর কখনো ঘরে ফেরেননি।

আর সেই সব সন্তানের প্রতি,
যাঁরা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে বাবার ফেরার অপেক্ষা করে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। শিহাবের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর। ওপাশ থেকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় কেউ বলল,

—নজরুলের ভাই? কথা বলেন। তাড়াতাড়ি।

শিহাবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—ভাই কোথায়? ওর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর চাপা স্বরে লোকটা বলল,

—আপনার ভাইরে যুদ্ধে পাঠাইছে। আমরা কিছু করতে পারি নাই।

শিহাবের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেল।

নজরুল রাশিয়ায় গিয়েছিলেন নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে। যাওয়ার আগে বড় ভাইয়ের কাছে জমি বন্ধক রেখে নয় লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘কয়টা বছর কষ্ট করি। তারপর আর কারও কাছে হাত পাততে হইব না।’

কিন্তু বিদেশে পৌঁছানোর পর থেকেই সবকিছু বদলে গেল। কাজের কথা বলে যাঁরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরাই কেড়ে নিলেন পাসপোর্ট আর মুঠোফোন। এরপর শুরু হলো সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রতিবাদ করলে কী হবে, তা বুঝতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি।

২৯ জুলাই শেষবারের মতো পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন নজরুল।

সেদিন শিহাব ফোন ধরতেই বলেছিলেন,

—কিরে, মা কেমন আছে?

—ভালো। তোমার জন্য কান্দে। কবে আসবা?

নজরুল উত্তর দেননি। আশপাশে তখন চিৎকার, ছোটাছুটি, আর অচেনা ভাষায় নির্দেশ দেওয়ার শব্দ।

—ভাই, কথা কও না কেন?

এবার নজরুল নিচু গলায় বললেন,

—শিহাব, মন দিয়া শোন। আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে। আমি আর ফিরতে পারি কি না জানি না।

শিহাবের গলা শুকিয়ে গেল।

—কী কও ভাই! তুমি তো কাজ করতে গেছ!

—আমি কি জানি রে? আমার পাসপোর্ট নাই। ফোন নাই। পালানোর জায়গা নাই। আল্লাহ জানে, কী হবে।

একটু থেমে নজরুল বললেন,

— মাকে দেখিস। আমার ছেলেমেয়েগুলার খোঁজ রাখিস। ওদের যেন কষ্ট না হয়।

—ভাই, তুমি কোথায় আছ? লোকেশন পাঠাও। আমরা কিছু একটা করি!

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

—সবকিছু কি আর নিজের হাতে থাকে রে?

তারপর লাইন কেটে গেল।

শিহাব বারবার ফোন করলেন। নম্বর বন্ধ।

পরদিনও বন্ধ। তার পরদিনও।

বাড়িতে তখন বৃদ্ধ মা প্রতিদিন একই প্রশ্ন করেন,

—নজরুল ফোন দিছে?

শিহাব বলেন, ‘দেবে মা।’

কথাটা বলতে বলতে তাঁর নিজেরই মনে হয়, তিনি বুঝি একটা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।

দিন যায়। সপ্তাহ গড়ায়। কোনো খবর আসে না।

একদিন সকালে আবার ফোন আসে। এবার ওপাশের কণ্ঠটা আরও ভারী।

—ভাই, একটা খারাপ খবর আছে।

শিহাব কিছু বলার আগেই লোকটা জানায়, ড্রোন হামলায় নজরুল মারা গেছেন।

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। উঠানে বসে থাকা মা তখন ভাঙা কাঁথায় সেলাই করছিলেন। শিহাবের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝে গেলেন, কিছু একটা ঘটে গেছে।

—কী হইছে রে?

শিহাব উত্তর দিতে পারলেন না।

মা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে তখনো সূঁচ-সুতা।

—আমার নজরুলের কিছু হইছে?

এবার শিহাব আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। মায়ের পায়ের কাছে বসে কেঁদে উঠলেন।

মা প্রথমে কাঁদলেন না। ছেলের মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন,

—মিথ্যা কস না বাবা। আমার ছেলেটা তো কইছিল, টাকা পাঠাইব। আমার ওষুধ কিনে দিব।

কেউ তাঁকে বোঝাতে পারল না, যে ছেলে মায়ের ওষুধ কেনার জন্য বিদেশে গিয়েছিল, সেই ছেলের নিজের জীবনটাই আর রক্ষা পেল না।

নজরুলের মৃত্যুর পর শুরু হলো আরেক যুদ্ধ।

বড় ভাই যে জমি বন্ধক রেখে টাকা দিয়েছিলেন, তা ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নেই। নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর কোলে সোয়া এক বছরের মেয়ে, পাশে ছয় মাসের ছেলে। ঘরে চাল আছে কি না, পরদিন শিশুদের দুধ জুটবে কি না—সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে বড়।

একসময় ঢাকায় সবজির ব্যবসা করেছেন বড় ভাই। অভাবে রিকশাও চালিয়েছেন। এখন নিজের সংসার সামলানোই কঠিন। তবু ভাইয়ের রেখে যাওয়া সন্তানদের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

রাতে মা ঘুমাতে পারেন না। কখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, কখনো ছেলের পুরোনো জামাটা বুকে চেপে ধরেন।

এক রাতে শিহাবকে কাছে ডেকে মা বললেন,

—শিহাব, নজরুল কি মরার আগে আমার কথা কইছিল?

শিহাবের চোখ ভিজে উঠল।

—হ্যাঁ মা। তোমার কথাই কইছিল।

—কী কইছিল?

শিহাব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—কইছিল, ‘মাকে দেখিস, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি।’

মা ছেলের জামাটা আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল। তারপর খুব আস্তে বললেন,

—আমি তো ওরে বলছিলাম, বিদেশে যাইস, কিন্তু নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস। ও কি আমার কথা একবারও মনে করে নাই রে?

শিহাব মাকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর কাছে কোনো উত্তর ছিল না।

যে মানুষটা নয় লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, তার লাশটাও দেশে ফিরবে কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। তার রেখে যাওয়া পরিবারকে এখন ঋণ, অভাব আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়তে হবে।

আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের কোথাও, পড়ে আছে নজরুলের অসমাপ্ত স্বপ্ন।

তিনি যুদ্ধে যেতে চাননি। কারও শত্রুও ছিলেন না। তিনি শুধু চেয়েছিলেন, মায়ের ওষুধের টাকা যেন ফুরিয়ে না যায়, সন্তানদের মুখে যেন খাবার থাকে, আর বড় ভাইয়ের বন্ধক রাখা জমিটুকু যেন একদিন ফিরিয়ে দিতে পারেন।

কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তাঁর সেই স্বপ্নই তাঁকে নিয়ে গেল মৃত্যুর মুখে।

শেষ ফোনে তিনি নিজের জন্য কিছু চাননি। শুধু মায়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন ছোট ভাইকে।

‘যুদ্ধে যাচ্ছি, মাকে দেখিস।’

চারটি শব্দের মধ্যে আটকে রইল একটি পরিবারের বাকি জীবন।

লন্ডন, ২২ অক্টোবর ২০২৬