আড়ালের মানুষটি: খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ফাতেমা
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ৩০ ডিসেম্বর : রাজনীতির মঞ্চে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে বজ্রকণ্ঠে, যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশের বহু সংকট ও আন্দোলন—সেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাশে নীরবে, নিরলসভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেকজন। আলোচনায় আসেননি কখনো, ক্যামেরার সামনে যাননি ইচ্ছে করে। অথচ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়ার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছায়ার মতো জড়িয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর নাম ফাতেমা বেগম।
২০১০ সাল। ভোলার এক সাধারণ পরিবার থেকে আসা ফাতেমা বেগম গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় কাজ শুরু করেন গৃহকর্মী হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজের গণ্ডি ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী—ব্যক্তিগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাসভবন, কার্যালয়, রাজপথ, হাসপাতাল, কারাগার কিংবা বিদেশ—যেখানেই গেছেন খালেদা জিয়া, সেখানেই নীরবে পাশে থেকেছেন ফাতেমা।
বিএনপির চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা বলেন, খালেদা জিয়ার প্রতি ফাতেমার মমত্ববোধ ছিল গভীর। প্রয়োজনীয় বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া, শারীরিক অসুস্থতায় খেয়াল রাখা, মানসিকভাবে পাশে থাকা—সবই করতেন তিনি। বিনিময়ে চেয়েছেন খুব কমই। স্বল্পভাষী এই নারী দায়িত্বের বাইরে কখনো নিজেকে জাহির করেননি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হলে ফাতেমার জীবনে আসে আরেক কঠিন অধ্যায়। আইনজীবীদের আবেদনে তাঁকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে সঙ্গে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। ছয় দিনের মাথায় ফাতেমাও কারাগারে যান। এরপর প্রায় ২৫ মাস স্বেচ্ছায় তিনি কারাগারেই ছিলেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি থেকে যান—সহচর হিসেবে, ভরসা হিসেবে।
এর আগেও আন্দোলনের উত্তাল সময়গুলোতে ফাতেমাকে দেখা গেছে নীরব ছায়াসঙ্গী হিসেবে। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় গুলশান কার্যালয়ের সামনে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হলে পতাকা হাতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতেমা। ২০১৫ সালের শুরুতে টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানকালেও এক মুহূর্তের জন্য তাঁকে ছেড়ে যাননি।
প্রায় ৪০ বছর বয়সী ফাতেমা এক সন্তানের জননী। মা–বাবার সঙ্গে থাকতেন রাজধানীর শাহজাহানপুরে। বিএনপির কার্যালয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় এক নেতার মাধ্যমে তাঁর ‘ফিরোজা’য় কাজ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক হয়ে ওঠে বিশ্বাস আর নির্ভরতার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ফাতেমা বেগমের এই দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গ কেবল চাকরির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মানবিক অধ্যায়। যেখানে ক্ষমতা, আন্দোলন ও কারাবাসের ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকে এক নিঃশব্দ নারী—যিনি সব দেখেছেন, সব সহ্য করেছেন, অথচ নিজেকে রেখেছেন আড়ালেই।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর সেই আড়ালের মানুষটিও যেন হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে উঠলেন। ইতিহাসের পাদপ্রদীপে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের গভীর কোনে—এক বিশ্বস্ত সঙ্গীর প্রতিচ্ছবি হয়ে।