ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে প্রথম হাজিরা দিলেন ট্রাম্প
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১ এপ্রিল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়ে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) বাতিলের উদ্যোগের পক্ষে আপিল শুনানিতে অংশ নিলেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশটির ইতিহাসে প্রথম ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত থাকার নজির গড়লেন।

বুধবার অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি নির্বাহী আদেশ নিয়ে আলোচনা হয়, যা তিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে জারি করেছিলেন। এই আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সব শিশুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রচলিত নিয়ম বাতিলের প্রস্তাব করা হয়—বিশেষ করে এমন শিশুদের ক্ষেত্রে, যাদের বাবা-মা মার্কিন নাগরিক নন বা বৈধ অভিবাসী নন।
বিতর্কের মূল কারণ
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান নীতি মূলত দাসপ্রথার সময় আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চালু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি অবৈধ অভিবাসীদের দ্বারা অপব্যবহৃত হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এই নীতি অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে।
তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের শুরুতেই একাধিক পরিবার আদালতে চ্যালেঞ্জ জানায়। নিম্ন আদালতের বিচারকরা রায় দেন, এই আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর পরিপন্থী, ফলে তা অসাংবিধানিক।
সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই
ফেডারেল আদালতগুলো যখন এই আদেশ কার্যকর হতে বাধা দেয়, তখন ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়। অবশেষে গত ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ আদালত এই মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে।
শুনানিতে ট্রাম্পের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন মার্কিন সলিসিটর জেনারেল ডি জন সাওয়ার। তিনি বলেন, “অসীম জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি নাগরিকত্বের মূল্যকে খাটো করে।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই নীতি অবৈধ অভিবাসনের জন্য একটি শক্তিশালী আকর্ষণ তৈরি করে এবং আইন ভঙ্গকারীদের পুরস্কৃত করে।
সংবিধান বনাম ব্যাখ্যা
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী, যা ১৮৬৮ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর প্রণীত হয়। এতে বলা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় নাগরিক হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি দেশটির নাগরিক।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এই সংশোধনীর “subject to the jurisdiction thereof” বাক্যাংশটির অর্থ হলো—শুধু যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই নাগরিক হওয়া যাবে না। বরং নাগরিকত্ব পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবারের প্রধান আনুগত্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি থাকতে হবে।
প্রশাসনের মতে, এই আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয় “আইনসম্মত স্থায়ী বসবাস” (lawful domicile)-এর মাধ্যমে, যা নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আদালতের অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রভাব
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যা ৬-৩ অনুপাতে বেশি, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক হতে পারে। ইতোমধ্যে অভিবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে আদালত ট্রাম্পের পক্ষে আংশিক সমর্থন দিয়েছে—যেমন গণ-নির্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণ বা মানবিক সুরক্ষা বাতিলের মতো পদক্ষেপ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নীতিকেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার বিতর্কেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রশ্নে এই আইনি লড়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, অভিবাসন নীতি এবং রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের সরাসরি আদালতে উপস্থিতি এই ইস্যুর গুরুত্ব ও রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এখন সবার দৃষ্টি সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের দিকে—যা নির্ধারণ করবে, আমেরিকার নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ভবিষ্যতে কীভাবে বদলাবে।