ইসরায়েল এখন নজর ঘোরাচ্ছে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১ এপ্রিল:
ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য বদলে এখন ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর এক মাসেরও বেশি সময় পর, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ধীরে ধীরে তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রায় শেষ করে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বোমা হামলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ কারখানা এবং বিমানবন্দরসহ বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত মাথায় রেখে গত সপ্তাহে ইসরায়েল দ্রুতগতিতে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
এখন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ইরানের অবকাঠামোতে আঘাত হেনে দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করার পরিকল্পনা করছেন। এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, কারণ এর আগে ইসরায়েলের তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার সমালোচনা করেছিল ওয়াশিংটন—যার জবাবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
ইসরায়েলি কৌশলবিদরা মনে করছেন, ইরানের অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে, যদিও দেশটি এখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ইসরায়েলে স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সীমিতসংখ্যক বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দুজনই প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে ইরানে শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে ইসরায়েলি কৌশলবিদদের ধারণা, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ইরানের জনগণকে বিদ্রোহে উসকে দেওয়ার মতো “পরিস্থিতি তৈরি” করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। মঙ্গলবার ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলায় তাদের বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘তোফিঘ দারু’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদন করে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ হামলাকে “নির্লজ্জ বোমাবর্ষণ” বলে আখ্যা দেন।
এছাড়া ক্রমশ আরও বেশি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও রাসায়নিক কারখানা, তেল শোধনাগার, পানি সংরক্ষণাগার, লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট, বিমানবন্দর এবং বিশ্ববিদ্যালয়।
সোমবার আইডিএফের এক মুখপাত্র বলেন, ইসরায়েল “আরও কয়েক সপ্তাহ” ইরানে হামলা চালাতে সক্ষম। লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য আছে, অস্ত্র আছে, জনবল আছে—এখন সিদ্ধান্ত নেতৃত্বের।”
এর আগে নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ ইতোমধ্যেই “মধ্যপথের অনেকটাই পেরিয়ে গেছে”, তবে কবে এটি শেষ হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
অন্যদিকে, আইডিএফ ধীরে ধীরে নিম্নস্তরের ইরানি শাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা কমিয়ে এনেছে, বিশেষ করে আদর্শিক সংগঠন বাসিজ মিলিশিয়ার সদস্যদের ওপর। এই অভিযানে ড্রোন ও বিমান হামলার মাধ্যমে স্থানীয় চেকপোস্ট ও ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল জনবিদ্রোহ উসকে দেওয়া।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশাবাদী যে ইরান শিগগিরই একটি চুক্তিতে সম্মত হবে, তবে তা না হলে তিনি দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দেন। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার কোনো চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত থেকে সরে আসতে পারে।
পরবর্তীতে তিনি ইসফাহানে একটি মার্কিন হামলার ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে ২,০০০ পাউন্ড ওজনের বাঙ্কার-বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করে একটি গোলাবারুদ গুদাম ধ্বংস করা হয়। ওই হামলায় একাধিক বিস্ফোরণ দেখা যায়। ধারণা করা হয়, ইসফাহানে ইরানের কিছু ইউরেনিয়াম মজুদ ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা আছে।
এদিকে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে ইসরায়েলের আরও চার সেনা নিহত হয়েছে বলে মঙ্গলবার জানানো হয়। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা লেবাননের লিতানি নদী ও ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তের মধ্যে একটি “নিরাপত্তা অঞ্চল” গড়ে তুলছে, যার উদ্দেশ্য ইসরায়েলি নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া।
এই অঞ্চলে কতদিন ইসরায়েল অবস্থান করবে তা স্পষ্ট নয়, তবে কিছু মন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন—এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে নেতানিয়াহু নাকি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, যাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনার সময় লেবাননের এই অভিযানকে আলাদা রাখা হয়।