কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৬।। প্রণালীর নাম হরমুজ: ট্রাম্প ভেবেছিলেন তরমুজ
উৎসর্গ
বিশ্ব রাজনীতির বোঝা বয়ে চলা সেই সাধারণ মানুষদের,
যাঁরা জানেন—হরমুজ কখনো তরমুজ নয়।”

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন বাস্তবতা আর বক্তব্যের মধ্যে ব্যবধান এতটাই বিস্তৃত হয়ে যায় যে, তা প্রায় ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সাম্প্রতিক বিভিন্ন মন্তব্য ঠিক তেমনই উদাহরণ—যেখানে কৌশলগত গভীরতার জায়গায় দেখা যায় সরলীকৃত, প্রায় অবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি।
হরমুজ প্রণালি—এটি কোনো সাধারণ জলপথ নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে চলাচল করে, যা ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে সচল রাখে। এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু আঞ্চলিক প্রভাব নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও পরোক্ষ কর্তৃত্ব।
কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। বরং তিনি মিত্রদের উদ্দেশে বলেন—“নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করো।” ভাবে মনে হয়, হরমুজকে কেটে তরমুজের মতো ইচ্ছামত খেয়ে নাও। অনেকটা মামাবাড়ির আব্দারের মতো শোনায়। যেন হরমুজ কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্র নয়, বরং একটি উন্মুক্ত বাজার, যেখানে শক্তিশালী হলেই সবকিছু পাওয়া যায়।
এখানেই মূল সমস্যা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোনো ব্যবসায়িক দরকষাকষি নয়, যেখানে চাপ প্রয়োগ করলেই প্রতিপক্ষ নতি স্বীকার করবে। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ ইরান—যারা বহু বছর ধরে কৌশলগত ধৈর্য ও অসম যুদ্ধনীতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এছাড়া পারস্য সভ্যতার দেশ ইরান পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো সভ্যতার একটি। এদেশকে কেউ বেশিদিন দাবায়ে রাখতে পারেনি, এমনকি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটকেও, থ্রেট খেয়ে কিছুদিন পরে ইরান ত্যাগ করতে হয়েছে।
ইরান জানে, সরাসরি যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো সম্ভব নয়। কিন্তু তারা এটাও জানে, হরমুজ প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি করলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ড্রোন, কিংবা একটি জাহাজে হামলা—এই ছোট ছোট ঘটনাই বড় অর্থনৈতিক ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প নিজেও এক পর্যায়ে স্বীকার করেছেন—“৯৯ শতাংশ সফলতা অর্থহীন, যদি ১ শতাংশে বড় ক্ষতি হয়।” এই স্বীকারোক্তি থেকেই বোঝা যায়, বাস্তবতা তাকে চাপে ফেলেছে।
তবুও তার বক্তব্যে একধরনের দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে; অন্যদিকে আরও সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেন। এটি কৌশল নয়, বরং একধরনের অনিশ্চয়তা—যেখানে সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রতিক্রিয়াই বেশি দৃশ্যমান।
আর এই অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপীয় মিত্ররা দ্বিধায়, আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির, এবং সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। কারণ তারা জানে—হরমুজ কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি জটিল বিষয়গুলোকে সহজ করে দেখতে চান। কিন্তু সব বিষয় সহজ নয়। বিশেষ করে যখন তা ভূরাজনীতি, যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো বহুস্তরীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
হরমুজ প্রণালি সেই জটিল বাস্তবতারই প্রতীক।
হরমুজ প্রণালী কোনো ‘তরমুজ’ নয়, যেটিকে কেটে সহজেই সমাধান পাওয়া যাবে। বরং এটি এমন একটি কৌশলগত গিঁট, যা ভুলভাবে টান দিলে আরও শক্ত হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—
ট্রাম্প কি এই জটিলতা উপলব্ধি করতে পারছেন?
নাকি তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, শক্তি প্রদর্শনই সব সমস্যার সমাধান?
যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে আশঙ্কা থেকেই যায়—
হরমুজকে তরমুজ ভেবে নেওয়ার এই ভুল
বিশ্বের জন্য এক গভীর সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।