বছরে লাখো সহায়তার আবেদন
বাংলাদেশে ঘরের নিরাপদ দেয়ালের আড়ালে বাড়ছে সহিংসতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১ আগস্ট:
পরিবারকে যেখানে নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানেই এখন বাড়ছে সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার ঘটনা। স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, সন্তানের হাতে বাবা-মায়ের নির্যাতন, শিশুদের ওপর সহিংসতা কিংবা বয়স্কদের ওপর অবহেলা—পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরের এই সংকট ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশে।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় হেল্পলাইন, জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সহায়তা চেয়ে ফোন করছেন। কিন্তু অনেক ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়াচ্ছে না; সামাজিক চাপ, পারিবারিক সমঝোতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে ভুক্তভোগীদের বড় অংশ আইনি পদক্ষেপ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
হেল্পলাইনে প্রতিদিন হাজারো অভিযোগ
জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু পারিবারিক সহিংসতার বিষয়ে সহায়তা চেয়ে ফোন এসেছে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৫২৩টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এ ধরনের ফোনকলের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬০ হাজারের বেশি।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ হেল্পলাইনে যোগাযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিয়ে, অপহরণ, পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন জাতীয় হেল্পলাইন কেন্দ্রে গড়ে কয়েক হাজার ফোন আসে। তবে জনবল সংকটের কারণে সব অভিযোগ সমানভাবে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সহিংসতা কখনো কখনো পৌঁছাচ্ছে হত্যাকাণ্ডে
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক গৃহবধূকে ঘরের একটি কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। দুই সন্তানের মা ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন বলে অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে বরিশালের মুলাদীতে নিখোঁজের কয়েকদিন পর এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক, পারিবারিক বিরোধ, অর্থনৈতিক সংকট ও সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিরোধ শেষ হচ্ছে হত্যা বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায়।
মামলা কম, অভিযোগ বেশি
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর আওতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মামলার সংখ্যা খুবই কম। অথচ ৯৯৯ নম্বরে নিয়মিত পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পরিবার সামাজিক সম্মান, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে আইনি ব্যবস্থা নিতে চায় না। অনেক সময় স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়, ফলে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতাকে শুধু পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে। কারণ ঘরের ভেতরের নির্যাতন অনেক সময় বড় অপরাধে রূপ নেয়।
মানসিক চাপ ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক চাপ, সম্পর্কের অবনতি, পারিবারিক মূল্যবোধের দুর্বলতা এবং আইনের প্রয়োগে ধীরগতি এ সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
তাদের মতে, শুধু আইন নয়, প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পারিবারিক সহিংসতা কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি পুলিশ, আদালত, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান ও হেল্পলাইনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
কারণ ঘরের ভেতরের নির্যাতন অনেক সময় বাইরে দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু নীরব সেই কষ্ট একসময় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিরাপদ পরিবার গড়তে হলে ঘরের ভেতরের সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।