ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১২ ।। দূরের খেলা, কাছের মৃত্যু

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প      ।। ১২ ।।    দূরের খেলা, কাছের মৃত্যু

।। দূরের খেলা, কাছের মৃত্যু ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ
খেলাকে ভালোবেসেও যারা ঘৃণাকে ভালোবাসেননি—সেসব প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমীদের

আমেরিকার স্টেডিয়ামে আজ ফুটবল উৎসব।

সবুজ ঘাসের ওপর বল গড়ায়। গ্যালারিতে হাজার হাজার মানুষ পতাকা উড়ায়। ব্রাজিলের সমর্থক ব্রাজিলের জন্য চিৎকার করে, জাপানের সমর্থক জাপানের জন্য। খেলা শেষ হলে তারা কেউ বাড়ি ফিরবে হাসিমুখে, কেউ একটু মন খারাপ নিয়ে। আগামীকাল আবার তারা একই অফিসে যাবে, একই ট্রেনে উঠবে, একই রেস্তোরাঁয় বসে কফি খাবে।

খেলা তাদের কাছে খেলা।

ঠিক তখনই ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক চায়ের দোকানে বসে আছেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুল করিম হাওলাদার। মাঝে মাঝে চলন্ত মানুষের মুখ দেখেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে। এভাবে সন্ধেটা কাটিয়ে বাড়ি ফেরেন। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। তিনি কখনো হঠাৎ যে কোন দোকানে বসে পড়েন। চা খান, খবরের কাগজ পড়েন, আর মানুষের মুখ পড়েন। অবসরের পরে এটাই এখন তাঁর ধারাবাহিক রুটিন কাজ। আজও বসে পড়েন তেমনি একটি চায়ের দোকানে। স্কুলে তিনি অসাধারণ স্মৃতিশক্তিধর শিক্ষক ছিলেন। ইদানিং তাঁর নিজের মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে কি তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন? হতেও পারে। আজকাল চারপাশে যা ঘটছে তাতে স্মৃতিশক্তি কম থাকাই ভাল। 

দোকানের এক কোণে কয়েকজন তরুণ বিশ্বকাপ নিয়ে তর্ক করছে।

—ব্রাজিলের মতো ফুটবল পৃথিবীতে আর কেউ খেলতে পারে না।

—জাপানকে ছোট করে দেখো না। ওরা সাইজে ছোট হলেও এক একটা ‘বুলেট’।

বৃদ্ধ হেসে বলেন,

—বাবারা, আমার একটা কথা শোনো, খেলাটা আমেরিকায় হচ্ছে। তোমরা চা খাও, খেলাটা উপভোগ করো। দু-চারজন তরুণ মুখ ঘুরিয়ে বৃদ্ধকে দেখে।

কেউ তাঁর কথা শোনে না।

চায়ের দোকানদার টিভির শব্দ একটু বাড়িয়ে দেয়।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ বাড়ি ফিরে যান।

সন্ধ্যার পর মোবাইল ফোনে একটি খবর ভেসে ওঠে।

মোহাম্মদপুরে বিশ্বকাপের খেলা নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে শালিসে একজন নিহত।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

বলেন,

—একটা খেলা... একটা প্রাণ...

তার স্ত্রী অবাক হয়ে তাকান।

—এমনও হয় নাকি?

বৃদ্ধ উত্তর দেন না।

এর এক ঘণ্টা পর আবার ফোন বেজে ওঠে।

আরেকটি সংবাদ।

সিলেটের জকিগঞ্জে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে গিয়ে তর্ক। চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে ভাই নিহত।

বৃদ্ধ এবার চশমা খুলে টেবিলে রাখেন।

খবর দুটি আবার পড়েন।

একটি ঢাকা।

একটি সিলেট।

দুটি জেলার দূরত্ব অনেক।

কিন্তু মৃত্যুর কারণ এক।

রাতে টেলিভিশনে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলছে। ক্যামেরা বারবার গ্যালারিতে বসা দর্শকদের দেখায়। কেউ মুখে রঙ মেখেছে, কেউ প্রতিপক্ষের সমর্থকের সঙ্গে হাসতে হাসতে ছবি তুলছে। খেলা শেষ হলে তারা একে অপরকে করমর্দন করছে।

বৃদ্ধ টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করেন,

—ওরা খেলাকে ভালোবাসে... আমরা ভালোবাসি ঝগড়া।

ঠিক তখন তাঁর নাতি এসে পাশে বসে।

—দাদু, তুমি কোন দলের সাপোর্টার?

বৃদ্ধ একটু হেসে বলেন,

—আমি ফুটবলের সাপোর্টার।

নাতি অবাক হয়।

—ওটা আবার কোনো দল?

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকান।

রাস্তায় অন্ধকার নেমে এসেছে।

তিনি ধীরে ধীরে বলেন,

—যে খেলায় মানুষ আনন্দ পায়, আমি সেই দলের।

নাতি আবার জিজ্ঞেস করে,

—তাহলে মানুষ মারামারি করে কেন?

বৃদ্ধের চোখে জল চিকচিক করে।

তিনি উত্তর দেন,

—কারণ তারা খেলাটাকে আর খেলা থাকতে দেয় না। নিজের অহংকার বানিয়ে ফেলে।

পরদিন সকালে তিনি বাজারে যান।

সবাই বিশ্বকাপের ফল নিয়ে আলোচনা করছে।

কেউ একজন বলে,

—কাল কী দারুণ ম্যাচ!

বৃদ্ধ আস্তে করে জিজ্ঞেস করেন,

—মোহাম্মদপুরের মানুষটা কি ফিরেছে?

চারপাশে নীরবতা।

তিনি আবার বলেন,

—সিলেটের সেই ছেলেটা?

আরও নীরবতা।

বৃদ্ধ চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলেন,

অদ্ভুত দেশ! যে খেলোয়াড়দের জন্য আমরা মরছি, তারা আমাদের নামও জানে না। যে দেশের পতাকা নিয়ে আমরা রক্ত ঝরাচ্ছি, সেই দেশের মানুষ জানেই না বাংলাদেশের কোনো গলিতে তাদের জন্য দুই চাচাতো ভাই, দুই প্রতিবেশী, দুই পরিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

চায়ের দোকানে কেউ আর কথা বলে না।

দূরে টেলিভিশনে আবার বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন শুরু হয়।

পর্দায় লেখা ভেসে ওঠে—

"Football Unites the World."

বৃদ্ধ তিক্ত হেসে বলেন,

—হয়তো পৃথিবীকে এক করে। কিন্তু আমরা যদি মানুষ হতে না শিখি, তাহলে এই খেলাই আমাদের আলাদা করে দেবে।

চায়ের কাপের শেষ চুমুক দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান।

মনে হয়, আজ আমেরিকায় কোনো দল হারেনি।

হারে শুধু বাংলাদেশ।

কারণ আমরা এখনও খেলাকে খেলা হিসেবে দেখতে শিখিনি; তাই হাজার হাজার মাইল দূরের একটি ম্যাচের উত্তেজনায়, নিজের পাশের মানুষটিকেই হারিয়ে ফেলি।

লন্ডন, ২ জুলাই ২০২৬