অনিয়মের অভিযোগ প্রায় ২৫০ কোটি
নকশার ভুলে থমকে ১৭ হাজার কোটি টাকার ঢাকা-সিলেট করিডর
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২ জুলাই:: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উদ্যোগ ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এখন নকশাগত ত্রুটি, জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি, ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের অধিকাংশ পার হলেও বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, প্রকল্পের মূল নকশা তৈরির সময় ভূতাত্ত্বিক অবস্থা ও বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন স্থানে দুর্বল মাটি ও কাদার স্তর শনাক্ত হওয়ায় নকশা পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভূমি উন্নয়ন এবং নতুন প্রকৌশল সমাধানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এতে প্রকল্পের সময়সূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে শুরু হওয়া ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হলেও চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪২২ কোটি টাকা, যার বড় অংশই এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হওয়া কঠিন বলে মনে করছে আইএমইডি।
অগ্রগতির ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের বিলম্বকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জমির এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি এখন পর্যন্ত প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। একইভাবে পুরো সড়কের অর্ধেকেরও কম অংশ ঠিকাদারদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরে কিছু অগ্রগতি থাকলেও গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।
সরকারি নিরীক্ষায় প্রকল্পে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে চুক্তি প্রদান, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, ভ্যাট ও আয়কর আদায় না করা, অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত অর্থ ছাড়, বাধ্যতামূলক বিমা না করা এবং কাজ সম্পন্ন না হয়েও বিল পরিশোধের মতো নানা অনিয়ম। এসব আপত্তির অধিকাংশই এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
এদিকে নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। কিছু স্থানে ব্যবহৃত কংক্রিটের শক্তি নকশার নির্ধারিত মানের নিচে পাওয়া গেছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থায়ও ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রকল্পের প্রভাব স্থানীয় জনগণের জীবনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্মাণকাজের ধুলাবালি, শব্দদূষণ, বর্জ্য এবং পানি নিষ্কাশন সমস্যায় অধিকাংশ বাসিন্দা ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে অসন্তোষও ব্যাপক; অনেক মালিক এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি, আবার অনেকে প্রাপ্ত অর্থকে ন্যায্য মূল্য বলে মনে করছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি অধিগ্রহণ, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, নকশা অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের কার্যক্রমে দ্রুত গতি আনা না গেলে এই মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও সময়—দুটিই আরও বাড়বে। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কার্যকর তদারকি এবং নির্মাণমান নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি ভবিষ্যতে দেশের পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।