তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ইইউর সঙ্গে নতুন চুক্তিতে তিনটি শর্ত নিয়ে বিতর্ক, ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে
ভয়েস অব পিপল লন্ডন ডেস্ক, ৫ নভেম্বর :
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনায় যুক্তরাজ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফাঁস হওয়া একটি খসড়া নথিতে দেখা গেছে, ইইউর বিদ্যুৎবাজারে প্রবেশের বিনিময়ে ব্রিটেনের কাছ থেকে আর্থিক অবদান, ইউরোপীয় অপরাধীদের আগাম বহিষ্কার বন্ধ এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত নিয়মে সমন্বয়ের প্রত্যাশা রয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সম্মেলনের আগে ইইউর তৈরি করা একটি খসড়া যৌথ বিবৃতিতে এসব শর্ত উঠে এসেছে।
তবে নথিটি এখনো ইইউর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনুমোদন পায়নি। এটি মূলত আলোচনার প্রাথমিক অবস্থান। ব্রিটিশ সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপীয় অপরাধীদের বহিষ্কার বন্ধের প্রস্তাবে যুক্তরাজ্য সম্মত হবে না।
ইইউর তিনটি প্রধান দাবি
১. ইউরোপের দরিদ্র অঞ্চলগুলোর জন্য ব্রিটেনের অর্থায়ন
ইইউর বিদ্যুৎবাজারে প্রবেশের বিনিময়ে যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর জন্য উপযুক্ত আর্থিক অবদান রাখতে হবে বলে খসড়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ, ব্রিটিশ বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ইউরোপীয় বাজারে বাণিজ্যের সুযোগ পেতে চাইলে যুক্তরাজ্যকে ইইউর কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অর্থ দিতে হতে পারে।
২. ইউরোপীয় অপরাধীদের আগাম বহিষ্কার বন্ধ
খসড়া নথিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক অপরাধীদের আগাম বহিষ্কার বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া থেকে যুক্তরাজ্য বিরত থাকবে।
ব্রিটেনের নতুন আইনে বিদেশি নাগরিকদের সাজা ঘোষণার পরই বহিষ্কারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কারাগারের ওপর চাপ কমানো এবং বিদেশি অপরাধীদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো।
কিন্তু ইইউর কয়েকটি দেশ মনে করে, কোনো বন্দিকে আগাম মুক্তি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের পর্যাপ্ত তথ্য ও আগাম নোটিশ দেওয়া প্রয়োজন।
এই বিষয়টি এখন দুই পক্ষের আলোচনায় অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. ইউরোপীয় নিয়মের সঙ্গে ব্রিটেনের সমন্বয়
ইইউর বিদ্যুৎবাজারে প্রবেশের জন্য ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েক শ নিয়মের সঙ্গে নিজেদের আইন ও নীতির সমন্বয় করতে হতে পারে।
ব্রেক্সিটের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে আইন ও নীতি নির্ধারণ করা। ফলে নতুন চুক্তির মাধ্যমে আবারও ইউরোপীয় নিয়মের সঙ্গে সমন্বয় করতে হলে তা ব্রেক্সিটপন্থীদের কাছে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠবে।
বিরোধীদের অভিযোগ
কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপ বলেছেন, লেবার পার্টি বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে চাইছে।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি নিয়ে চলছে। অথচ সরকার ব্রাসেলসকে সন্তুষ্ট রাখতে বিদেশি অপরাধীদের দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে আগ্রহী।
ফিলপের ভাষায়, এটি ‘সাধারণ বোধের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা’।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী কনজারভেটিভ সরকার ক্ষমতায় এলে সব বিদেশি অপরাধীকে বহিষ্কার করবে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ উপেক্ষা করা দায়িত্বহীনতার শামিল হবে। তবে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়ে জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক
২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার। ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে দেশটি।
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন বাজার ও কাস্টমস ইউনিয়নের বাইরে চলে যায়। এর ফলে অভিবাসন, বাণিজ্য, আইন এবং অর্থনৈতিক নীতিতে স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়টি ব্রেক্সিটপন্থীদের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক জটিলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বার্নহাম এর আগে বলেছিলেন, তাঁর জীবদ্দশায় যুক্তরাজ্যকে আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে দেখতে চান। তবে তিনি এখনই ব্রেক্সিট বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেননি।
আগামী ২০ নভেম্বরের সম্মেলনের আগে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার ব্যবধান এখনো যথেষ্ট। বিশেষ করে বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কার, আর্থিক অবদান এবং ইউরোপীয় নিয়মের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।