তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ব্রিটেনে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমছে, ২০৩০-এর দশকেই কমতে পারে জনসংখ্যা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৫ নভেম্বর :
যুক্তরাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি দ্রুত কমে আসছে। জন্মহার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং অভিবাসন কমে যাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দশকে দেশটির জনসংখ্যার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। এমনকি ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরবর্তী সময়ে কমতে শুরু করার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।
৫ নভেম্বর প্রকাশিত ফিন্যানশিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকছে। পাশাপাশি সরকারের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যাও কমছে। ফলে অতীতের মতো অভিবাসনের ওপর নির্ভর করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (ওএনএস) প্রকাশিত ২০২৪-ভিত্তিক জনসংখ্যার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ। ২০৩৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৭ কোটি ১০ লাখ হতে পারে। অর্থাৎ আগামী ১০ বছরে জনসংখ্যা বাড়বে প্রায় ১৭ লাখ বা ২ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জনসংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৪৭ লাখ বা ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ওএনএসের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ২০৫৪ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখে পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে। এরপর জনসংখ্যা কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হচ্ছে
ব্রিটেনের জনসংখ্যা পরিবর্তনের অন্যতম কারণ জন্মহার কমে যাওয়া। ওএনএসের হিসাবে, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ৬৩ লাখ ৯৬ হাজার শিশুর জন্ম হতে পারে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ ৪৬ হাজার। অর্থাৎ জন্মের তুলনায় মৃত্যু প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার বেশি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
ওএনএসের হিসাবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। ফলে অভিবাসন ছাড়া দেশের নিজস্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্বাভাবিক উৎস কার্যত নেতিবাচক হয়ে পড়বে।
কমছে অভিবাসন
ব্রিটেনের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদেশি নাগরিকদের আগমন জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন, ভিসার শর্ত কঠোর করা এবং শিক্ষার্থী ও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের কারণে নিট অভিবাসন কমেছে।
অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটির (ওবিআর) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ের জন্য নিট অভিবাসন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আবাসন ও শিক্ষা খাতে কী প্রভাব পড়বে?
জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমলে আবাসন, স্কুল, পরিবহন ও স্থানীয় পরিষেবার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নতুন মানুষের আগমন বেশি, সেখানে বাড়ি, স্কুল ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদার পরিবর্তন ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, শিশু জন্মের সংখ্যা কমলে ভবিষ্যতে কিছু এলাকায় স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যে জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে কিছু এলাকায় স্কুল বন্ধ বা একীভূত করার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে বলে ফিন্যানশিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল, সামাজিক পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। ওএনএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে পেনশন বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ হতে পারে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ
জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে শ্রমবাজারে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম বাড়লে কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাতে কর্মীসংকট তৈরি হতে পারে।
এতে সরকারের কর আদায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পেনশন তহবিলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় অবসরপ্রাপ্ত মানুষের অনুপাত বাড়লে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ও বাড়বে।
তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর চাপ কমতে পারে। পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারেও কিছুটা ভারসাম্য আসতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মীসংকটের কিছুটা মোকাবিলা সম্ভব।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য জনসংখ্যার এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বড় অংশ স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ব্যবসা ও অন্যান্য সেবামূলক পেশার সঙ্গে যুক্ত।
ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি বাড়লে এসব খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের চাহিদা তৈরি হতে পারে। তবে অভিবাসন নীতির কঠোরতা এবং বিদেশ থেকে নতুন কর্মী আনার বিধিনিষেধের কারণে সেই সুযোগ সবার জন্য সমান হবে না।
অন্যদিকে, বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাতে ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব কর, সরকারি ব্যয় এবং পেনশন নীতিতেও পড়তে পারে। ফলে বর্তমানে কর্মরত প্রবাসীদের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ব্রিটেনের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মক্ষম জনসংখ্যা ধরে রাখা। জন্মহার কমে যাওয়া এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়ার বাস্তবতায় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনের বড় নীতিগত পরীক্ষা।