‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

নেতানিয়াহুর নতুন চাপ, ইরানে আবারও হামলা চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ

নেতানিয়াহুর নতুন চাপ, ইরানে আবারও হামলা চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৬ নভেম্বর :

ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সম্প্রতি দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে আলোচনায় নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানবিষয়ক পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। নেতানিয়াহু নতুন সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিলেও ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক উদ্যোগকে সুযোগ দিতে চাইছেন।

এদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তির চেষ্টা চলছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু করা।

কী রয়েছে সম্ভাব্য সমঝোতায়?

কাতারের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশটির কিছু জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

প্রাথমিক সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর চুক্তির আলোচনা শুরু হতে পারে।

তবে আলোচনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শন এবং সমঝোতার শর্তগুলো কোন ক্রমে বাস্তবায়িত হবে—এসব বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধ রয়েছে। ইরান এই উপাদান দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের অবস্থান কী?

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তবে দেশটির কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ করা সম্পদের বিষয়ে সমাধান ছাড়া তারা সহজে কোনো চুক্তিতে যাবে না।

৫ নভেম্বর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে তেহরান আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কয়েকটি শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে।

ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে দেশটি শক্তিশালী পাল্টা জবাব দেবে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির উদ্বেগ

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও জাহাজ পরিবহন ব্যয় ব্যাপকভাবে ওঠানামা করছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ছিল। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি যে প্রণালিটি সমুদ্রের মাইনমুক্ত।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের মূল্য আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।

ট্রাম্পের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের ইরাননীতি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কে এসেছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পর ট্রাম্পকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করবেন, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটাবেন।

এদিকে ৫ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন।

অর্থাৎ একদিকে নেতানিয়াহু নতুন হামলার জন্য চাপ দিচ্ছেন, অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।