বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা: ৯ অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ
ঢাকা প্রতিনিধি, ৬ ফেব্রুয়ারি: শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো এই ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে দলটি।
বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে কুরআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান শুরু হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যায় যায় দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিন পত্রিকার মতিউর রহমান চৌধুরীসহ দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং নানা শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শরিক দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফুর রহমান এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর রব ইউসুফীসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতা।
বিএনপির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, আসাদুজ্জামান রিপন এবং চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিহউল্লাহ। এছাড়া অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, অধ্যাপক আনম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ও অধ্যাপক নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শেষাংশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
বিএনপির ইশতেহারের মূল দফাগুলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ঘোষিত বিএনপির ইশতেহার পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। দলটি বলছে—এটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের একটি রূপরেখা।
১. রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার
- গণতন্ত্র ও জাতিগঠনকে শক্তিশালী করা
- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে সংরক্ষণ
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রসংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তি
- সাংবিধানিক সংস্কার
- সুশাসন প্রতিষ্ঠা
- স্থানীয় সরকারকে স্বাধীন ও কার্যকর করা
২. বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন
- নিম্নআয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’
- প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য সরবরাহ
- কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও কৃষি বীমা
- মৎস্যচাষি, খামারি ও ক্ষুদ্র কৃষি উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তি
৩. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কার
- দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
- জেলা–মহানগরে মানসম্মত চিকিৎসা
- মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা
- রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ
- দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি
- প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব
- শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা
- স্কুলে ‘মিড-ডে মিল’ চালু
৪. তরুণদের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি
- নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি
- কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন
- স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা
- বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ
- মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ
- কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ
- ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা
৫. ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি
- সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী
- প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা
- জেলা–উপজেলায় ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণ
- পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ
- আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (যেমন পেপাল) চালু
- ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন
- ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ
সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব
ইশতেহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে—
- সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
- উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি
- প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা
- সংসদে উচ্চকক্ষ
- উচ্চকক্ষে ১০% নারী
- বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
- জুলাই হত্যার বিচার
- গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা
দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিতা—বিএনপির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
তারেক রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তার দাবি—এই তিনটি ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হবে না।