প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটে অনীহা: ভয়েস অব পিপলের অনুসন্ধানী সমীক্ষায় উঠে এল অজানা বাস্তবতা

প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটে অনীহা: ভয়েস অব পিপলের অনুসন্ধানী সমীক্ষায় উঠে এল অজানা বাস্তবতা

ভয়েস অব পিপল অনুসন্ধানী রিপোর্ট, ৭ ফেব্রুয়ারি:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য বড় পরিসরে পোস্টাল ভোটের সুযোগ তৈরি করা হলেও প্রত্যাশিত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশির বিপরীতে দেশে ফিরেছে মাত্র লাখ হাজার ৪৬০টি পোস্টাল ব্যালট—যা মোট সম্ভাব্য ভোটারের তুলনায় অত্যন্ত কম।

নির্বাচন কমিশনের ‘ওসিভি–এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানান, শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের কাছে পাঠানো লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালটের প্রায় অর্ধেক দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে লাখ ২৬ হাজার ৪৯৮ জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং লাখ ৮২ হাজার ৮১৭ জন ভোট দিয়েছেন।

দেশে অবস্থানরত (আইসিপিভি) ভোটারদের কাছেও পাঠানো হয়েছে লাখ ৯৪ হাজার ১৪৬ ব্যালট, যার মধ্যে লাখ ২৪ হাজার জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৪ জন ভোট দিয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—দেড় কোটি প্রবাসীর মধ্যে এত কম অংশগ্রহণ কেন?

ভয়েস অব পিপল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লন্ডন, ইউরোপের বিভিন্ন শহর এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে অধিকাংশই নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।

প্রবাসীদের অভিমত: ভোটের চেয়ে ভয় বড়

যুক্তরাজ্য: উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সংশয়

যুক্তরাজ্যে অনুমোদিত ভোটার সংখ্যা ৩২,৩০৫। অনেকেই ভোট দিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করলেও তাদের বড় অংশই প্রশ্ন তুলেছেন ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
একজন লন্ডন প্রবাসী বলেন—
ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে, কিন্তু ভোটটা কতটা স্বচ্ছভাবে কাউন্ট হবেসেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরেকজন জানান, প্রচারণা কম হওয়ায় দ্বিতীয় প্রজন্মের ভোটাররা আগ্রহ হারিয়েছে।
এটা নিয়ে যথেষ্ট মার্কেটিং হয়নি। যারা রাজনীতি সচেতন, তারাই মূলত ভোট দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য: ভয়, সন্দেহ আর ক্লান্তির বাস্তবতা

মালয়েশিয়ায় অনুমোদিত ভোটার ৮৪,১৯৫ জন। ভোট দিয়েছেন ৪৫,৩৯১ জন।
কিন্তু অনেকেই জানিয়েছেন—

  • দেশে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ
  • ভোটার তালিকায় নাম থাকলে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা বাড়তে পারে
  • আবার কেউ কেউ বলেছেন, নাম থাকলে সম্পত্তি বিক্রি করতে সুবিধা হয়

অর্থাৎ, ভোটের চেয়ে সম্পত্তি-সংক্রান্ত ভয় বিভ্রান্তি বেশি প্রভাব ফেলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমজীবী প্রবাসীরা বলেছেন—
দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করি। পোস্ট অফিসে গিয়ে ব্যালট পাঠানো মানে বাড়তি ঝামেলা।

ভাইরাল ভিডিও আস্থাহীনতা

বাহরাইনে একাধিক পোস্টাল ব্যালট গোনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অভিযোগ ওঠে, সেগুলো জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার বাসা থেকে পাওয়া গেছে।
যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে—একজনের কাছে একই এলাকার সহকর্মীদের ব্যালট দেওয়া হয়, তাই একসঙ্গে অনেক খাম দেখা যেতেই পারে।

তবুও এই ঘটনা প্রবাসীদের মধ্যে আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়েছে

সমীক্ষায় উঠে আসা প্রধান কারণগুলো

. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে ভয়

অনেকেই মনে করেন—

  • এনআইডি, পাসপোর্ট, জন্ম তারিখ, ঠিকানা অনলাইনে দিলে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হতে পারে। কারণ আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন।
  • বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় রাজনৈতিক তথ্য দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ
  • সব তথ্য দিয়ে দিলে, সেইসব আইডি ব্যবহার করে কেউ যদি দেশের জায়গা জমি ইত্যাদি নিজের নামে ‘নামজারি’ করে নেয়- তার নিশ্চয়তা কি?
  • পোস্টালে ভোট দিলে কোন দলকে আমরা ভোট দিয়েছি তা জানা যাবে অনায়াসে। আমার দল ভোটে হারলে পরে বিজয়ী দল আমার তথ্য নিয়ে দেশে আমাদের স্বজনদের নাজেহাল করতে পারে-এই ভয়ে অনেকে পোস্টালে ভোট দেননি।

. অ্যাপ প্রযুক্তিগত জটিলতা

  • ওটিপি না পাওয়া
  • স্ক্যানিং সমস্যা
  • অ্যাপ ক্র্যাশ
  • ভাষাগত অসুবিধা
    মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকদের বড় অংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও অ্যাপ-ভিত্তিক প্রক্রিয়া তাদের জন্য কঠিন।

. ডাকসেবার প্রতি অনাস্থা

  • ব্যালট সময়মতো পৌঁছাবে কিনা
  • হারিয়ে যাবে কিনা
  • গণনায় ধরা হবে কিনা
    এই অনিশ্চয়তা অংশগ্রহণ কমিয়েছে।

. ভোট দিলে লাভ কীএই প্রশ্ন

অনেকের মতে—

  • দেশে থাকেন না, তাই ভোট দিলেও জীবনে পরিবর্তন আসে না
  • প্রবাসী কল্যাণ বা ভিসা নীতিতে ভোটের প্রভাব নেই
  • রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ভোটকেই গুরুত্ব দেয় না

একজন প্রবাসীর ভাষায়—
দেশে সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। বিদেশে এসে আবার ভোটের ঝামেলা কেন?”

. সময়, শ্রম খরচ

  • অ্যাপে নিবন্ধন
  • ব্যালট গ্রহণ
  • পোস্ট অফিসে জমা
    অনেকের মতে—
    পোস্টাল ভোট দেওয়া আজাইরা প্যাচাল।

. সচেতনতার অভাব

  • অনেকেই জানতেন না যে তারা পোস্টাল ভোট দিতে পারেন
  • প্রচারণা সব দেশে পৌঁছায়নি
  • শ্রমিক ক্যাম্পে তথ্য পৌঁছানো কঠিন

প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভয়েস অব পিপলের অনুসন্ধানী সমীক্ষা বলছে—
প্রযুক্তিগত জটিলতা, আস্থাহীনতা, রাজনৈতিক সংশয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সময়ের অভাবএই পাঁচটি কারণই প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পোস্টাল ভোট কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।