বিশ্ব বই দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ কলাম
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৭ ।। বই পড়া: মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠ
উৎসর্গ’
আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর, বাংলাদেশের বই পড়া আন্দোলনের পথিকৃৎ, সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক—আমার সারা জীবনের বইপড়ার অনুপ্রেরণার অন্যতম নায়ক এবং যাঁর ব্যক্তিগত সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল, সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারকে

কেউ যদি আমাকে এককথায় প্রশ্ন করেন, এই পৃথিবীতে একজন মানুষের প্রথম ও প্রধান কাজ কি, তাহলে বলবো আমি “বই পড়া”। কারণ এর উপরে দাঁড়িয়ে আছে—কে কতটুকু মানুষ হলাম, কতটুকু মহৎ হলাম,কে, কতটুকু আশরাফুল মখলুকাত হলাম।
মানবজাতিকে আল্লাহর প্রথম বাণী হচ্ছে ইকরা—অর্থাৎ পড়ো। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথমেই বলা হয়নি—কলমা শাহাদত পড়ো, অথবা সালাত পড়ো, রোজা রাখো, যাকাত আদায় কর কিংবা হজ আদায় কর। প্রশ্ন জাগে—এর মর্মার্থ কি?
কারণ খুব সহজ। একজন মানুষ যখন পড়বে, তখন সে ভালো-মন্দ বুঝতে শিখবে। তার বিবেক জাগ্রত হবে। সে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝবে। তখন সে নিজের তাগিদেই সৎ পথের দিকে এগিয়ে যাবে। জ্ঞান তাকে পথ দেখাবে।

আজ ৫ মার্চ World Book Day। সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাবার সময় পুরো ব্রিটেনের ছাত্র-ছাত্রীরা যেভাবে এ দিনে বিভিন্ন রং বেরং এর ড্রেস পরে স্কুলে যায় তাতে মনে হয় ঈদ উৎসব এসে গেছে। মনটা তখন খুবই ফুরফুরে লাগে। কারণ আমার পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ার শুরু সেই ক্লাশ এইট/নাইন থেকে, সিলেট শহরের স্টেডিয়ামের পাশের পাবলিক লাইব্রেরিতে। এখনো সেই অভ্যাস আছে, সময় সুযোগে। অবশ্য ঘরে যে ব্যক্তিগত পাঠাগার আছে তাও ছোটখাটো একটা গ্রন্থাগারের চেয়েও কম নয় বৈকি। তাই সব সময় বাইরে ‘আইডিয়া স্টোরে’ যাওয়া লাগে না আরকি।
আজও আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হচ্ছে ‘বই’। প্রথম লন্ডনে এসে সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম ব্রিকলেনের ভিতরে শাহনূর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত বুকশপ ‘সঙ্গীতা’ দেখে। আর সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম কয়েক বছর পরে ক্রেতার অভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যেতে দেখে। এখনও তাই দেশে গেলে সুটকেস ভরে বই-ই নিয়ে আসি, অন্য কিছু নয়। কারণ লন্ডনে সবই কিনতে পাওয়া যায়, তবে বাংলা বই নয়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি আশা করেছিলাম আমার বিয়েতে যারা আসবে তাঁরা অন্তত একটি করে বই উপহার দেবে। কারণ তখন ‘সঙ্গীতা’ খোলা ছিল। কিন্তু হায় আফসোস, বেশিরভাগই দিলো খামভরা কিছু টাকা, একটি বইও উপহার পেলাম না। এ আফসোস জীবনেও যাবে না। কারণ এত বছর পরে তো আর এটা রিপিট করা সম্ভব নয় !

‘বিশ্ব বই দিবস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বই কেবল বিনোদনের বস্তু নয়; এটি মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় আলোকবর্তিকা। পৃথিবীর প্রতিটি উন্নত জাতির ইতিহাস খুলে দেখলে দেখা যাবে, তাঁদের অগ্রযাত্রার মূলে ছিল জ্ঞানচর্চা এবং বই পড়ার সংস্কৃতি। এই ব্রিটেনেও তারা আজ যে পর্যায়ে এগিয়েছে তার মূলে এই বইপড়ালব্ধ জ্ঞান। মুসলমানরা এক সময় সারা বিশ্ব শাসন করেছিল এই বইপড়ার জ্ঞান থেকেই। মূলত সারা বিশ্বই দাঁড়িয়ে আছে জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে। আর জ্ঞান অর্জনের সেরা পথই হচ্ছে ‘বই পড়া’, ‘ফেইসবুক’ পড়া নয়। কারণ ফেইসবুকে থাকে ফেইস দেখানোর প্রতিযোগিতা আর বেশিরভাগই ফেইক নিউজ।
বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না; বই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। বই মানুষকে বিনয়ী করে, উদার করে, মানবিক করে। একটি ভালো বই একজন মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রযুক্তির অভাব দেখি না। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন—সবই আমাদের হাতের নাগালে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এইসব কি আমাদের মননকে সমৃদ্ধ করছে? নাকি আমাদের মনোযোগকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে?
একজন পাঠক যখন একটি বই পড়েন, তখন তিনি কেবল একটি গল্প পড়েন না; তিনি আরেকটি জীবন অনুভব করেন। তিনি অন্য সংস্কৃতি, অন্য সময়, অন্য মানুষের ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হন। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে বড় করে, গভীর করে।
একটি জাতির মানসিক শক্তি নির্ভর করে তার পাঠাভ্যাসের উপর। যে সমাজে বইয়ের কদর কমে যায়, সেখানে চিন্তার গভীরতাও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। আর যে সমাজে বই পড়া সম্মানের বিষয় হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ও মানবিকতা বিকশিত হয়।
এ কারণেই ইতিহাসের প্রতিটি জ্ঞানী মানুষ বইকে নিজের সঙ্গী করেছেন। বইয়ের ভেতর দিয়ে তারা পৃথিবীকে চিনেছেন, নিজেদের চিনেছেন, এবং মানবতার বৃহত্তর সত্যকে উপলব্ধি করেছেন।
আজকের বিশ্বে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নৈতিক ও মানবিক মানুষ তৈরি করা। আর সেই মানুষ তৈরির সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পথ হলো—ভালো বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা।
এরিস্টটলের ছাত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট অবশ্যই বই পড়েছিলেন তার মহান গুরু এরিস্টটল-এর কাছে। অ্যাডলফ হিটলার এবং আজকের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—এরাও নিশ্চয়ই শিক্ষা জীবনে কমবেশি বই পড়েছে।
কিন্তু আমি সেই ধরনের গতানুগতিক বই পড়ার কথা বলছি না। আমি বলছি সেই বইয়ের কথা—যেগুলো মানুষের হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে, মানুষকে ভালো হতে শেখায়, নৈতিক হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস দেয়।
পড়তে হবে পৃথিবীর সেরা লেখকদের বই, পড়তে হবে মহান মানুষদের জীবনী। সেইসাথে পড়তে হবে বিশ্বমানবের গাইড বইটিও। সেটি পবিত্র কোরআন-বিভিন্ন জ্ঞানের আঁধার। সাথে সাথে পড়া উচিত পৃথিবীর সেরা সেরা মনিষীদের লেখা জীবনী ও তাঁদের লেখা মাস্টারপিসগুলো। এই ধরনের বই মানুষকে শুধু জ্ঞানী করে না, মানুষকে মানবিক করে তোলে।
মানুষের শেষ পরিনতি কি, জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি কি করতে হয়, কিভাবে মানবিক মানুষ হতে হয়, কিভাবে লোভ সংবরণ করতে হয়, কিভাবে অন্যের সাথে, বিশ্বে মানবের সাথে, বিশ্ব পরিবেশকে নিজের ভাবতে হয়, কিভাবে এই মহাবিশ্ব চলছে, মহাবিশ্বটা কত বড়, কিভাবে ঘুরছে, এর পেছনের শক্তি কি, এই পৃথিবী নামক ছোট্ট মারবেল পাথরের মতো ছোট্ট গ্রহটির পরিণতি কি, মানব সভ্যতার শেষ পরিণতি কি, আগের মানব সভ্যতা কেমন ছিল, ওরা কি করে গেছে, এদের পরিণতি কি হয়েছে, আমাদের এখনকার সভ্যতা কি করছি, এর পরিণতি কি হতে পারে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেলে কি করতে হয়, না করলে কি হয়, অন্যের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কি-এসব নানামুখী বিষয় জানতে হলে একজন মানুষকে বই পড়তেই হবে। আর শেষ বিচার দিবসে তো অবশ্যই শেষ জমানার সব মানুষকে শেষ ধর্ম গ্রন্থের আলোকে প্রশ্ন করা হবে। অবশ্য তার আগের সভ্যতার মানবগোষ্ঠীকে তাঁদের নিজ নিজ সময়ের ধর্মগ্রন্থের আলোকে প্রশ্ন করা হবে। এসব নানা প্রশ্নের জবাব কোন ক্লাশের বইতে নেই।
তাই তো আমরা দেখি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ডিগ্রিটি নিয়েও অজ্ঞের মতো কথাবার্তা বলেন, দূর্নীতি করেন, মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করেন। আসলে এসব ডিগ্রি মানুষ গ্রহণ করে, বড় হয়ে একটা ভাল চাকরি বাকরি পাবার আশায়। ঐ সময় প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চিন্তা অনেকেরেই মাথায় থাকে না। আগামী কোন এক পর্বে আমাদের তথাকথিত ডিগ্রিধারীদের মেধা ও মনন নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে। কারণ লেখাটি বেশ বড় হয়ে গেছে আজ।
মানুষ তো আশরাফুল মখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী বই পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ পারে। জীবন তো একটাই। তাই এই এক জীবনেই এসব জানতে হবে। এ হিসাবে বই পড়ার অন্য কোন বিকল্প নেই।
‘বিশ্ব বই দিবসে’ তাই আমাদের প্রত্যেকের কাছে একটাই উদার আহ্বান—
বই পড়ুন, নিজেকে চিনুন।
কারণ সত্যিকার অর্থে একটি ভালো বই-ই পারে একজন মানুষকে কেবল শিক্ষিত নয়, আলোকিত মানুষে পরিণত করতে।
অনেকে ‘কলিকালের কলধ্বনি’ সিরিজের কলাম পড়ে মন্তব্য করতে চান বা মেসেজ পাঠাতে চান। অনেকে নিজের লেখা বা খবরাখবর পাঠাতে চান। তাই তাঁদের সবার জন্য নিচের ইমেইল ও মোবাইল নাম্বার দেয়া হলো :
Email: msnirjhor786@gmail.com Mob: 07944 640 390
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৫ মার্চ ২০২৬