জ্বালানি সংকট থেকে ছুটি বাতিল—দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় আঘাতের আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের তেলের ধাক্কা: ব্রিটেনে সংকট, বাড়তে পারে দাম, কমতে পারে গতি
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক | লন্ডন, ৫ এপ্রিল:
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই—তার সরাসরি অভিঘাত ইউরোপ হয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে পড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব হতে পারে কোভিড মহামারি বা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের মতো ভয়াবহ।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেন, “আমি এই যুদ্ধ এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ২৪ ঘণ্টা ভাবি। এমন অনেক তথ্য জানতে হচ্ছে যা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।”
তার এই উদ্বেগ এখন পুরো ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রথম ধাক্কা: দাম বাড়ছে, কিন্তু বিপদ আরও বড়
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে।
যদিও শুরুতে অতিরিক্ত মজুত, ভাসমান জাহাজে থাকা তেল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর রিজার্ভ থেকে সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে, কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন—এই “বাফার” খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।
রিস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক পাওলা রদ্রিগেজ-মাসিউর মতে,
বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি থাকলেও, তা দ্রুত বেড়ে ৮০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
ব্রিটেনে কী ঘটতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ব্রিটেনে নিচের পরিস্থিতিগুলো দেখা দিতে পারে—
- জ্বালানির তীব্র সংকট
- পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আরও বৃদ্ধি
- গ্রীষ্মকালীন ছুটি বাতিল
- বিমান চলাচল কমে যাওয়া
- খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি
- অর্থনীতিতে স্থবিরতা
ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৬০% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে একটি সাধারণ পরিবারের গাড়িতে ডিজেল ভরতে এখন খরচ হচ্ছে ১০০ পাউন্ডেরও বেশি।
উড়োজাহাজ খাত সবচেয়ে ঝুঁকিতে
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের প্রথম বড় আঘাত আসবে বিমান খাতে।
ইউরোপে আসা শেষ জ্বালানি ট্যাংকারগুলো পৌঁছে যাওয়ার পরই দেখা দিতে পারে ঘাটতি।
এভিয়েশন বিশ্লেষক অ্যালেক্স মাচেরাস সতর্ক করে বলেন—
“এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরুতেই ফ্লাইট কমাতে হতে পারে। এতে ভাড়া বাড়বে এবং অনেক ফ্লাইট বাতিল হবে।”
বিশেষ করে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর—যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০০ ফ্লাইট পরিচালিত হয়—এটিকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের সম্ভাব্য কঠোর পদক্ষেপ
সংকট তীব্র হলে ব্রিটিশ সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। যেমন—
- বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশনা
- মহাসড়কে গতি সীমা কমানো
- জ্বালানি রেশনিং
- জরুরি সেবার জন্য নির্দিষ্ট পাম্প সংরক্ষণ
১৯৭০-এর দশকের মতো ৫০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতি সীমা আরোপের কথাও বিবেচনায় আসতে পারে।
মে–জুন: আরও খারাপ সময়?
যদি মে ও জুন পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে—
- তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়াতে পারে
- সরকারগুলোর রিজার্ভ শেষ হয়ে যেতে পারে
- ধনী দেশগুলো বেশি দাম দিয়ে তেল কিনবে
- দরিদ্র দেশগুলোতে রেশনিং শুরু হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, তখন বিশ্ব অর্থনীতি ঢুকে পড়বে “ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন” পর্যায়ে—যেখানে মানুষ ও ব্যবসা বাধ্য হয়ে জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে দেয়।
খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচে, আর তার ফল হিসেবে বাড়ে খাদ্যের দাম।
অর্থাৎ এই সংকট শুধু গাড়ির পাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—প্রভাব পড়বে বাজারের প্রতিটি পণ্যে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কঠিন সিদ্ধান্ত
এপ্রিলের শেষে সুদের হার বাড়ানো হবে কি না—তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড।
গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি বলেছেন—
“আমাদের এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি কম হয়।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—
এই সংকট সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটেনের অর্থনীতি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ভাষায়—
“এই যুদ্ধের খেসারত মানুষকে আগামী দশকজুড়ে দিতে হতে পারে।”