‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

অ্যাঞ্জেলা জীবনভর খুঁজেছেন, উত্তর পেলেন কোরআনে

অ্যাঞ্জেলা জীবনভর খুঁজেছেন, উত্তর পেলেন কোরআনে

জীবনধারা ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ৬ নভেম্বর:

মানুষের ধর্মীয় পরিচয় কি শুধু জন্ম, পরিবার কিংবা সামাজিক পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি দীর্ঘ অনুসন্ধান, চিন্তা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের বিশ্বাসের নতুন পরিচয় খুঁজে পেতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের এক আদিবাসী নারী অ্যাঞ্জেলার জীবনকাহিনি এই প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে আসে।

ছোটবেলা কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকায়। পরিবারে ছিল সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক জীবনচর্চা। কিন্তু সেই বিশ্বাসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয় ছিল না। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন তিনি। ক্যাথলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন, বিভিন্ন ধর্মের বই পড়েছেন, প্রশ্ন করেছেন। শেষ পর্যন্ত ইসলামের শিক্ষার মধ্যে নিজের দীর্ঘদিনের আত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে মিল খুঁজে পান।

অ্যাঞ্জেলার এই অভিজ্ঞতা কেবল একজন নারীর ধর্মান্তরের গল্প নয়; এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং মানুষের সত্য অনুসন্ধানের একটি ব্যক্তিগত আখ্যান।

শৈশবের স্মৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন

অ্যাঞ্জেলার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শৈশব কেটেছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাদা-দাদি সব সময় সৃষ্টিকর্তার কথা বলতেন। তাঁকে নানা গল্প শোনাতেন এবং শেখাতেন, মানুষের প্রতিটি কাজের মধ্যেই প্রার্থনার প্রতিফলন থাকা উচিত।

তাঁদের কাছে প্রার্থনা শুধু নির্দিষ্ট সময়ে চোখ বন্ধ করে কিছু বলার বিষয় ছিল না। বরং প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি আচরণ এবং মানুষের সঙ্গে প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যেই প্রার্থনার অর্থ খুঁজে নেওয়ার শিক্ষা ছিল।

অ্যাঞ্জেলা বলেন, তাঁদের এই জীবনদর্শনের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় নাম ছিল না। ফলে বড় হওয়ার পর যখন কেউ তাঁকে প্রশ্ন করত, তাঁর ধর্ম কী, তখন তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো পরিচয় দিতে পারতেন না।

মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর জীবনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তাঁকে পাঠানো হয় একটি ক্যাথলিক আবাসিক বিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁকে দুই বছর থাকতে হয়েছিল। তাঁর ধারণা, আদিবাসী শিশুদের মূলধারার আমেরিকান সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূত করার উদ্দেশ্যেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

সেই বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে ধর্ম সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি বুঝতে পারেন, ক্যাথলিক ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে তাঁর নিজের বিশ্বাস ও উপলব্ধির মিল হচ্ছে না।

এখানে অ্যাঞ্জেলার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও মনে রাখা প্রয়োজন। দেশটির আদিবাসী শিশুদের পরিবার ও নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ২০২২ সালের তদন্তে ১৮১৯ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ৩৭টি অঙ্গরাজ্য ও তৎকালীন অঞ্চলে ৪০৮টি ফেডারেল আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়ের তথ্য উঠে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের মধ্যে আদিবাসী শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে মূলধারার সমাজে একীভূত করার নীতিও ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু, কবরস্থান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আরও তথ্য যুক্ত হয়।

তবে অ্যাঞ্জেলার নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের নাম, অবস্থান কিংবা তাঁর পরিবারের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে উল্লেখ নেই। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে যুক্তরাষ্ট্রের সব আদিবাসী শিশুর অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিভিন্ন ধর্মের সন্ধানে

বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার পর অ্যাঞ্জেলা নিজের মতো করে ধর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা শুরু করেন। যে ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পেতেন, সেটি নিয়ে পড়তেন, বোঝার চেষ্টা করতেন। কিন্তু কোনো একটি ধর্মের শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি আত্মিক সংযোগ অনুভব করতে পারছিলেন না।

তাঁর মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসত—মানুষ যত বেশি প্রার্থনাই করুক, সে কখনো সৃষ্টিকর্তা হয়ে উঠতে পারে না। তাহলে সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃত ব্যাখ্যা কী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই একসময় একজন মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁদের মধ্যে ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মুসলিম ব্যক্তিটির জীবনাচরণ দেখে তিনি বিস্মিত হন। কারণ, তাঁর নিজের পরিবারে ছোটবেলা থেকে যে ধরনের প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক জীবনচর্চা দেখে এসেছেন, তার সঙ্গে ইসলামের কিছু শিক্ষার মিল খুঁজে পান।

অ্যাঞ্জেলার উপলব্ধি ছিল, তিনি এত দিন যে বিষয়গুলো নিজের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে জেনে এসেছেন, ইসলামের মধ্যেও সেগুলোর অনেক পরিচিত ব্যাখ্যা রয়েছে।

এরপর তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। বিভিন্ন বিষয় জানার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আগ্রহও বাড়তে থাকে।

একটি বইয়ের স্তূপে নতুন পথের সন্ধান

অ্যাঞ্জেলার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল একটি মুদি দোকানে।

একদিন দোকানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে পুরোনো বই সংগ্রহ ও বিক্রির একটি ছোট ব্যবস্থা রয়েছে। মানুষ নিজেদের পড়া বই সেখানে জমা দেয়। অন্যরা সেসব বই কিনে নেয় এবং বিক্রির অর্থ দাতব্য কাজে ব্যয় করা হয়।

বইয়ের স্তূপের ওপরেই তাঁর চোখে পড়ে ইসলামবিষয়ক কয়েকটি বই। বিষয়টি তাঁর আগ্রহ তৈরি করে। তিনি পুরো স্তূপের বই কিনে বাড়ি ফিরে যান।

এরপর শুরু হয় নিবিড় পড়াশোনা। বইগুলো পড়তে গিয়ে ইসলামের বিভিন্ন শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি পবিত্র কোরআন পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে কোরআন পড়ার শুরুটা তাঁর জন্য একেবারে সহজ ছিল না। কিছু বিষয়ে তিনি নিজের দাদা ও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা ধারণার সঙ্গে পার্থক্য খুঁজে পান। কোথাও মিল, কোথাও অমিল—সব মিলিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।

কিন্তু তিনি পড়া বন্ধ করেননি। বরং যত পড়েছেন, ততই ইসলামের একত্ববাদ, সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রার্থনার তাৎপর্য নিয়ে ভাবনার সুযোগ পেয়েছেন।

একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়েছে, ছোটবেলা থেকে যে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন তিনি দেখে এসেছেন, তার অনেক কিছুর সঙ্গে ইসলামের শিক্ষার গভীর মিল রয়েছে।

তাঁর ভাষায়, ‘আমি তো সারা জীবন ধরেই এসব করে আসছি, অথচ কখনো জানতামই না।’

এই উপলব্ধিই তাঁর কাছে ইসলামকে অর্থবহ করে তোলে।

বিশ্বাসের মিল, পরিচয়ের নতুন উপলব্ধি

অ্যাঞ্জেলার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্ন করেছেন, পড়েছেন এবং বোঝার চেষ্টা করেছেন। কোনো একটি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই অন্য সবকিছু অস্বীকার করেননি। বরং নিজের পারিবারিক বিশ্বাস, পূর্বপুরুষদের শিক্ষা এবং বিভিন্ন ধর্মের বক্তব্যের মধ্যে তুলনা করেছেন।

এখানে তাঁর অভিজ্ঞতার একটি মানবিক দিক রয়েছে। মানুষের বিশ্বাস অনেক সময় পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে আসে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের অর্থ কী, কেন মানুষ প্রার্থনা করে, সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকে নিজের মতো করে খোঁজে।

অ্যাঞ্জেলা তাঁর অনুসন্ধানের মধ্যে ইসলামের শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর কাছে এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের চিন্তা ও পড়াশোনার পর পাওয়া একটি আত্মিক উপলব্ধি।

ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয়। তাই একজন মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যের বিশ্বাসের মূল্যায়ন করা যায় না। তবে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিবেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং জানার আগ্রহ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর গল্প তা মনে করিয়ে দেয়।