ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
সাবধান: হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেইসবুকের একটি বার্তাই ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
জীবনধারা ডেস্ক ভয়েস অব পিপল, ২৯ অক্টোবর:
নিজের মোবাইল ফোনে কয়েকটি শব্দ লিখে পাঠাতে কতক্ষণ লাগে? হয়তো কয়েক সেকেন্ড। ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়া, কারও ছবিতে মন্তব্য করা কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের কোনো গ্রুপে রাগের মাথায় কিছু লিখে ফেলতেও বেশি সময় লাগে না। কিন্তু মুহূর্তের আবেগে লেখা সেই কথাগুলো কখনো কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সমস্যা কিংবা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বিতর্ক, ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা কিংবা সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার অর্থ কাউকে হুমকি দেওয়া, সহিংসতায় উৎসাহিত করা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের অবাধ অনুমতি নয়।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব বাতিলসংক্রান্ত একটি মামলার খবর আবারও সামনে এনেছে, অনলাইনে প্রকাশিত বক্তব্য কখনো কখনো জাতীয় নিরাপত্তার মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। তবে এই ঘটনা থেকে এমন ধারণা করা ঠিক হবে না যে হোয়াটসঅ্যাপে বিতর্কিত কিছু লিখলেই কারও ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে। নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি প্রয়োজন; প্রতিটি ঘটনার তথ্য, প্রমাণ ও প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিবেচিত হয়। ফেসবুকে উসকানিমূলক মন্তব্য, অনলাইনে হুমকি কিংবা শিশুদের ছবি প্রকাশ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
ফেসবুকে যা খুশি লেখা যায় না
ফেসবুক এখন শুধু বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এখানে মানুষ রাজনীতি নিয়ে মত দেন, ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করেন, খবর শেয়ার করেন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন সমালোচনার জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালিগালাজ, হুমকি কিংবা সহিংসতার আহ্বান চলে আসে।
কোনো রাজনৈতিক নেতা বা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা অপরাধ নয়। কোনো ধর্মীয় বক্তব্যের সমালোচনা করাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ নয়। কিন্তু বক্তব্যের ধরন ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী হুমকি, হয়রানি, উসকানি বা অন্য কোনো বেআইনি আচরণের প্রশ্ন উঠতে পারে।
কেউ রাগের মাথায় লিখলেন, ‘ওকে দেখলে শেষ করে দেব’, ;তুমি একটা গর্দভ’, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আক্রমণ করার আহ্বান জানালেন। পরে তিনি বললেন, কথাটি নিছক মজা করে লেখা। কিন্তু শুধু লেখকের ব্যাখ্যাই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নয়। বক্তব্যটি কীভাবে লেখা হয়েছে, কাকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে এবং তার প্রেক্ষাপট কী—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো বক্তব্য আপত্তিকর হলেই সেটি আইনত অপরাধ, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো উচিত নয়। আইনি মূল্যায়ন নির্ভর করে নির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর।
হোয়াটসঅ্যাপের ব্যক্তিগত কথাও সামনে আসতে পারে
অনেকে মনে করেন, বন্ধুদের ব্যক্তিগত গ্রুপে যা লেখা হয়, তা বাইরের কেউ জানতে পারবেন না। বাস্তবে বার্তা প্রাপক সংরক্ষণ করতে পারেন, স্ক্রিনশট নিতে পারেন কিংবা অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন।
তাই কোনো বার্তা পাঠানোর আগে ভাবুন, কথাটি কি নিছক রসিকতা, নাকি অন্য কেউ সেটিকে বাস্তব হুমকি হিসেবে বুঝতে পারেন? কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আক্রমণ করার কথা লেখা, সহিংসতার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা কিংবা অন্যকে এমন কাজে উৎসাহ দেওয়া গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগলে প্রতিবাদ করুন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করুন। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যেন সহিংসতার আহ্বানে পরিণত না হয়।
শিশুদের ছবি প্রকাশেও সতর্কতা প্রয়োজন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুদের ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ। অনেক অভিভাবক ভালোবাসা থেকে সন্তানের ছবি, স্কুলের অনুষ্ঠান, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক ভ্রমণের মুহূর্ত ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এতে সব সময় সমস্যা হয় না। তবে ছবি প্রকাশের আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
শিশুর ছবি প্রকাশের ফলে তার অবস্থান, স্কুল, দৈনন্দিন চলাফেরা কিংবা পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশিত হতে পারে। ছবির সঙ্গে স্কুলের নাম, ইউনিফর্ম, বাড়ির অবস্থান বা নিয়মিত যাতায়াতের বিবরণ থাকলে অপরিচিত ব্যক্তিরাও শিশুটিকে শনাক্ত করার সুযোগ পেতে পারেন।
বিশেষ করে শিশুদের বিব্রতকর, অস্বস্তিকর বা ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আজ যে ছবি অভিভাবকের কাছে মজার মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই শিশুর জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠতে পারে।
অন্যের সন্তানের ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রেও অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া ভালো। স্কুলের অনুষ্ঠান বা পারিবারিক আয়োজনে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়ার আগে ছবিতে থাকা অন্য শিশুদের গোপনীয়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের ছবি নিয়ে অপরিচিত কেউ অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখালে বা ছবির অপব্যবহারের আশঙ্কা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানাতে হবে এবং শিশুর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, শিশুর ছবি অনলাইনে প্রকাশ করলেই তা বেআইনি হয়ে যায় না। ছবির ধরন, প্রকাশের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার এবং সম্ভাব্য অপব্যবহারের বিষয় বিবেচনা করে আইনি প্রশ্ন নির্ধারিত হয়।
একটি শেয়ারও ছড়াতে পারে ভুল তথ্য
অনেকেই কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করেই ফেসবুকে শেয়ার করেন। কেউ আবার পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার বলে প্রচার করেন, সম্পাদিত ভিডিও ছড়িয়ে দেন কিংবা যাচাই না করা অভিযোগকে সত্য হিসেবে তুলে ধরেন।
এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মানহানি বা অন্য আইনি প্রশ্নও তৈরি হতে পারে। তাই কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা এবং তথ্য নিশ্চিত না হলে সেটিকে সত্য বলে প্রচার না করাই দায়িত্বশীল আচরণ।
বিশেষ করে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ, প্রতারণা কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলে প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। অভিযোগ, তদন্ত ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়।
যুক্তরাজ্যে বসবাসকারীদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ
প্রথমত, রাগের মাথায় কোনো পোস্ট বা বার্তা প্রকাশ করবেন না। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে আবার পড়ে দেখুন।
দ্বিতীয়ত, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলুন।
তৃতীয়ত, কাউকে আক্রমণের হুমকি, গালাগালি, সহিংসতার আহ্বান কিংবা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার মতো ভাষা এড়িয়ে চলুন।
চতুর্থত, শিশুদের ছবি প্রকাশের আগে তাদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বিবেচনা করুন। স্কুল, বাসস্থান কিংবা নিয়মিত চলাফেরার মতো শনাক্তযোগ্য তথ্য অপ্রয়োজনে প্রকাশ করবেন না।
পঞ্চমত, কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করুন। সন্দেহজনক বার্তা, ভুয়া খবর কিংবা প্রতারণামূলক লিংক দেখলে যাচাই ছাড়া অন্যের কাছে পাঠাবেন না।
সবশেষে, কোনো পোস্ট বা বার্তা নিয়ে আইনি উদ্বেগ তৈরি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ আলোচনা থেকে আইনি সিদ্ধান্ত টানবেন না। পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর সঠিক ব্যবহার সমাজকে সচেতন করতে পারে। আবার দায়িত্বহীন ব্যবহার অন্যের সম্মান, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ক্ষতি করতে পারে।
ব্রিটেনে বসবাস করা মানে শুধু অধিকার ভোগ করা নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক ও সমাজের সদস্য হিসেবেও আচরণ করা। নিজের মত প্রকাশ করুন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলুন। কিন্তু কাউকে হুমকি দেবেন না, যাচাই না করা অভিযোগ ছড়াবেন না এবং শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অবহেলা করবেন না।
মনে রাখবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রকাশ করার অধিকার আপনার আছে; কিন্তু সেই প্রকাশের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সচেতন থাকা আপনার দায়িত্ব।